দেশের প্রতিটি কোনায় চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং ও মাদকের শেকড় উপড়ে ফেলতে খুব দ্রুত একটি নতুন ও কঠোর আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইন্সে আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভার পর সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় এই গুরুত্বপূর্ণ খবর জানান বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির।
শনিবার দুপুরে খুলনার সুধী সমাবেশ শেষে মিডিয়া ব্রিফিংকালে তিনি জানান, বর্তমানের জটিল আইনি প্রক্রিয়ার কারণে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সরাসরি কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া পুলিশের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু নতুন এই সংস্কারমূলক আইন কার্যকর হলে পুলিশ নিজস্ব ক্ষমতাবলে অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও মামলা দায়েরের এখতিয়ার পাবে।
আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির অত্যন্ত খোলামেলা ও সততার সাথে স্বীকার করেন যে, বিগত ১৭ বছরের শাসনকালে পুলিশের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের কারণে সাধারণ জনগণের সাথে এই বাহিনীর এক গভীর দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই ভাঙা বিশ্বাস ও হারানো আস্থা পুনরুদ্ধার করতেই তিনি রূপসা ও ভৈরব তীরের তৃণমূল পর্যায়ে ছুটে যাচ্ছেন।
খুলনাসহ সারা দেশে কীভাবে স্থায়ী শান্তি বজায় রাখা যায় এবং জনবান্ধব উপায়ে অপরাধ দমন করা যায়, সেই রূপরেখা তৈরি করতেই তাঁর এই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সফর। সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশকে এক আতঙ্কের নাম না বানিয়ে একটি আস্থার প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলাই এখন বর্তমান পুলিশ প্রশাসনের প্রধান ও পবিত্র লক্ষ্য।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, দেশের কোথাও কোনো ধরনের চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী কিংবা কিশোর গ্যাং সদস্যের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের দমনে ইতোমধ্যে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান চালু রয়েছে। অপরাধী চক্রগুলোকে চিরতরে উপড়ে ফেলতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এক বিন্দু ছাড় দেবে না বলে তিনি ঘোষণা দেন।
কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান যে এটিকে কেবল একটি সামাজিক সহযোগী সংগঠন হিসেবে না রেখে, এবার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ পুলিশের নিজস্ব কাঠামোগত শাখা হিসেবে রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের মাধ্যমে এই আইনি কাঠামো গঠনের কাজ চলছে।
কমিউনিটি পুলিশিং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলে অপরাধ দমনে সাধারণ মানুষ সরাসরি পুলিশের সাথে এক হয়ে কাজ করার আইনি ভিত্তি পাবে। এতে পাড়া-মহল্লায় অপরাধীদের গোপন তৎপরতার খবর পাওয়ার সাথে সাথে পুলিশী অ্যাকশন নিশ্চিত করা অনেক সহজ ও দ্রুততর হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন আইজিপি।
খুলনা অঞ্চলের বর্তমান সাময়িক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আইজিপি বেশ খানিকটা ক্ষোভ ও গভীর উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ইদানীংকালে সেখানে দেখা যাচ্ছে এক অপরাধী চক্র অন্য অপরাধীকে হত্যা করছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চতুরতার সাথে চরম আতঙ্ক ও ভীতির পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
পুলিশের কঠোর আইনি ভূমিকা নিতে গিয়ে সৃষ্ট এক বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক দ্বিমুখী সংকটের কথা উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি জানান, পুলিশের এই দুটি বিষয়ের মাঝামাঝি জায়গায় সামঞ্জস্য রেখে কাজ করাটাই বর্তমানে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইজিপি বলেন, অপরাধ দমন করতে গিয়ে পুলিশ যখন আইনানুযায়ী প্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ করে, তখন একদল লোক চট করে চিৎকার করে পুলিশকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিতে শুরু করে। আবার পুলিশ যখন পরিস্থিতি বিবেচনা করে শান্ত থেকে কাজ করে, তখন অন্য দল মন্তব্য করে পুলিশ নাকি দুর্বল হয়ে গেছে।
এমন বিভ্রান্তিকর দোলাচল ও বৈপরীত্য পুলিশ আর দেখতে চায় না বলে সাফ জানিয়ে দেন পুলিশ প্রধান। তিনি বলেন, কার কী সমালোচনা হলো তাতে কান না দিয়ে একটি শক্তিশালী, পেশাদার ও আইনের প্রতি অটল পুলিশ বাহিনীর মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলাই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার।
গত দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনামলে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে মাদকের ভয়াল থাবাকে যেভাবে এক ধরণের সামাজিক স্বীকৃতি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল, তা সমাজকে ভেতর থেকে পচিয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। বর্তমান সরকার এই মাদকের বিস্তারের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে।
এক প্রশ্নের জবাবে গত ৫ আগস্টের পর তৈরি হওয়া দেশের অরাজক পরিস্থিতির কথা জনসমক্ষে মনে করিয়ে দেন আইজিপি। তিনি বলেন, ওই সংকটময় মুহূর্তের পর দেশে কোনো দৃশ্যমান পুলিশ ব্যবস্থা ছিল না এবং অপরাধীরা সুযোগ বুঝে সর্বত্র সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল। তবে সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে পুলিশ এখন দেশের প্রতিটি প্রান্তে আবার নিয়মিত কার্যক্রম সচল করেছে।
বাংলাদেশ হলো বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ, যেখানে বেকারত্ব ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার মতো জটিল সামাজিক সংকট বহু বছর ধরে গেঁড়ে বসে আছে। এসব জটিল পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যার রাতারাতি কিংবা অলৌকিকভাবে একদিনে শতভাগ পরিবর্তন সম্ভব নয় বলে সাংবাদিক সম্মেলনে স্বীকার করেন পুলিশ প্রধান।
তিনি নিশ্চিত করেন যে, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানের সার্বিক দেশের পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে এবং প্রতিদিন পরিস্থিতি আরও বেশি ইতিবাচক রূপ নিচ্ছে। তিনি সাধারণ নাগরিকদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান, পুলিশকে ভয় না পেয়ে তাদের প্রকৃত বন্ধু ও পরামর্শক হিসেবে গ্রহণ করার জন্য।
আমরা রক্তচক্ষু দেখানো কোনো শাসক পুলিশ হতে চাই না, বরং সাধারণ মানুষের মন জয় করা এক মানবিক ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে চাই। অনাবশ্যক ভয় দেখানো বা রাজপথে শক্তি প্রদর্শন করার পুরোনো অপসংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করাই আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত।
তবে পুলিশের এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নমনীয় আচরণকে অনেক সময় অপরাধীরা সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে বলেও আক্ষেপ প্রকাশ করেন আইজিপি। অনেক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের ধরে আইনের আওতায় এনে আদালতে সোপর্দ করা হলেও, জামিনে বের হয়ে তারা আবারও একই ধরণের অপরাধমূলক অপকর্ম শুরু করছে।
অপরাধীদের আদালত থেকে দ্রুত জামিনে বের হয়ে আসা এবং পুনরায় অপরাধে জড়ানোর এই দুষ্টচক্র বন্ধ করতে বর্তমানে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে নতুন পলিসি ডেভেলপমেন্টের কাজ চলছে। যাতে আইনি ফাঁকফোকর গলে কোনো অপরাধী সমাজকে স্তব্ধ করতে না পারে, তার জন্য আইনি সংস্কার ত্বরান্বিত করা হচ্ছে।
সমাজের গভীরে প্রোথিত চাঁদাবাজি ব্যবস্থার এক অন্ধকার ও ভয়াল সত্য উন্মোচন করতে গিয়ে আইজিপি বলেন, যারা সরাসরি রাস্তায় নেমে চাঁদাবাজি করে, তারা আসলে চুনোপুঁটি। তারা সমাজের কোনো না কোনো অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা ভয়ংকর সন্ত্রাসী চক্রের হয়ে ছায়াসঙ্গী হিসেবে এই অপকর্মগুলো পরিচালনা করে।
সাধারণ দোকানদার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা পরিবহন শ্রমিকেরা তাদের অত্যাচার সহ্য করলেও মুখে মুখ খুলতে সাহস পান না। প্রভাবশালীদের ভয়ে ও আইনি জটিলতার আশঙ্কায় তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মামলা বা লিখিত অভিযোগ জানাতে ভয় পান।
জনগণের এই মনস্তাত্ত্বিক ভয় ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটাতে তিনি নিজেই সরাসরি উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানান। খুলনা আসার আগেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টার সাথে বৈঠক করে একটি যুগান্তকারী নতুন আইনের খসড়া তৈরির চূড়ান্ত রূপরেখা ঠিক করা হয়েছে।
আইজিপি স্পষ্ট ভাষায় জানান, এই নতুন আইন জারি হলে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের কোনো লিখিত অভিযোগের অপেক্ষায় পুলিশকে আর বসে থাকতে হবে না। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে গোপন তথ্য, অডিও বা ভিডিও প্রমাণ পেলেই পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তার করে মামলা দিয়ে দেবে।
আইনের এই বিশেষ ক্ষমতা পুলিশকে দেওয়া হলে চাঁদাবাজ চক্রগুলোর গডফাদারদের আস্তানা সহজেই গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তিনি। নতুন এই আইনের সুফল আগামী কিছুদিনের মধ্যেই দেশের মানুষ স্বচক্ষে দেখতে পাবে বলে আশ্বস্ত করেন মো. আলী হোসেন ফকির।
সমাজের মূল কেন্দ্র থেকে চাঁদাবাজদের অস্তিত্ব মুছে ফেলতে এই আইন এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করেন আইজিপি। তিনি মনে করেন, সাধারণ জনগণের সচেতনতা আর পুলিশের আইনি ক্ষমতার সুষম সমন্বয় ঘটলে পুরো দেশ থেকে যেকোনো ধরণের অপরাধ চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইন্সের এই সুধী সমাবেশ শেষে তিনি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও পুলিশ সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে এক শোষণহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে নিজের সংক্ষিপ্ত ও ফলপ্রসূ বক্তব্য শেষ করেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির।
আইজিপির এমন কড়া বার্তা এবং নতুন আইনের ঘোষণা দক্ষিণাঞ্চলের সাধারণ ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটগুলো এই বক্তব্যের পর থেকে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু করেছে।
খুলনার মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক নগরীতে শান্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পুলিশের এই কঠোর ও মানবিক অবস্থান ইতিবাচক ফল দেবে বলে মনে করছেন স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনে প্রস্তাবিত এই আইনটি কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং মাঠে এর কার্যকারিতা কেমন দেখা যায়।

