বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের ছন্দ ইদানীং থমকে যাচ্ছে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে। ভ্যাপসা গরম আর লোডশেডিংয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট জনজীবন যখন অতিষ্ঠ, ঠিক তখনই আশার আলো শোনালো সরকার। জ্বালানি গ্যাসের সংকট কেটে গেলেই দেশের সার্বিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর বিভিন্ন উন্নয়ন ও অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে দেশজুড়ে চলমান বিদ্যুৎ সংকট। মানুষের ভোগান্তি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থমকে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন উপদেষ্টা। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, বর্তমান বিদ্যুতের এই তীব্র সংকট সাময়িক। মূলত প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে প্রয়োজনীয় গ্যাসের পর্যাপ্ত যোগান না থাকাতেই কেন্দ্রগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। বিদ্যুৎ খাতের নীতিনির্ধারকরা আশাবাদী যে, সংকট আর বেশিদিন এভাবে প্রকট থাকবে না। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে সরবরাহ বৃদ্ধির জোর চেষ্টা চলছে। এই প্রক্রিয়াগুলো গতি পেলে খুব দ্রুতই বিদ্যুতের যোগান ও চাহিদার মধ্যে সমতা ফিরে আসবে।
রাজধানী ঢাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়েও অত্যন্ত খোলামেলা কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর এই তথ্য উপদেষ্টা। অতীতের ধারাক্রম ভেঙে এখন ঢাকাতেও কিছু কিছু এলাকায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। বিষয়টিকে বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। উপদেষ্টা বলেন, বৈশ্বিক ও জাতীয় এই সংকটময় মুহূর্তে রাজধানীর বাসিন্দাদেরও কিছুটা লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি সহ্য করার মানসিকতা রাখা উচিত।
অবশ্য ঢাকা দেশের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র হওয়ায় বিদ্যুতের বণ্টনে এটি কিছুটা অগ্রাধিকার পাবে, এটাই স্বাভাবিক। কারণ এখানে রয়েছে অসংখ্য শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক দেনদরবারের কেন্দ্রবিন্দু। তবে কেবল ঢাকাকে স্বস্তিতে রেখে দেশের বাকি অংশকে অন্ধকারে নিমজ্জিত রাখার পুরোনো নীতি থেকে বর্তমান সরকার সরে আসছে। ফলে ঢাকার সাধারণ মানুষকেও এখন বিদ্যুৎ ঘাটতির চাপ কিছুটা ভাগ করে নিতে হচ্ছে।
বিগত সরকারের আমলের বিদ্যুৎ বণ্টন নীতির দিকে ইঙ্গিত করে ডা. জাহেদ উর রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সারা দেশে তীব্র লোডশেডিং থাকলেও রাজধানী ঢাকাকে কৃত্রিমভাবে লোডশেডিংমুক্ত রাখা হতো। গ্রাম ও মফস্বলের লাখ লাখ মানুষকে অন্ধকারে রেখে কেবল ঢাকার আলো জ্বালিয়ে রাখার এই নীতি ছিল বৈষম্যমূলক।
এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, ঢাকার মানুষের ‘ভয়েস’ বা প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর অনেক বেশি জোরালো। রাজধানীর বাসিন্দাদের মধ্যে ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ বা সামাজিক পুঁজি বেশি থাকায় তাদের ক্ষোভ সরকারকে সহজে নাড়িয়ে দিতে পারত। ফলে তৎকালীন নীতিনির্ধারকরা রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে রাজপথ ও জনমতকে ঠাণ্ডা রাখতে ঢাকাকে বিশেষ সুবিধায় রাখতেন। আর এই কারণে ঢাকার মানুষের মধ্যে এমন এক মনস্তাত্ত্বিক ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, তারা হয়তো বিদ্যুৎ পাওয়ার ক্ষেত্রে সবার চেয়ে আলাদা।
বর্তমান সরকার সেই পুরোনো ও অসম নীতি পরিবর্তন করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘ঢাকাকে কোনো অবস্থাতেই লোডশেডিং ছোঁয়া যাবে না’—এমন অবাস্তব ও বৈষম্যমূলক মানসিকতা থেকে সরে আসা হচ্ছে। জাতীয় যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার ভাগ সমানভাবে না হলেও যৌক্তিকভাবে সবাইকে বহন করতে হবে। ফলে ঢাকার গ্রাহকদের মধ্যেও এখন কিছুটা বিদ্যুৎ না থাকার অভিজ্ঞতা তৈরি হচ্ছে, যা সার্বিক সমতার স্বার্থেই করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে উপদেষ্টা প্রমাণের চেষ্টা করেন যে, বর্তমান সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি অতীতের চেয়ে তুলনামূলক কম। শেখ হাসিনা সরকারের শেষ পূর্ণ বর্ষ হিসেবে ২০২৩ সালকে ভিত্তি ধরে তিনি একটি বাস্তব চিত্র উপস্থাপন করেন। ২০২৩ সাল এবং ২০২৬ সালের জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসের গড়ের সঙ্গে তুলনা করে তিনি দেখান যে, সার্বিক লোডশেডিংয়ের পরিমাণ আদতে কমেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুন মাসে দেশে প্রতিদিন গড়ে ৯৬৯ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি বা লোডশেডিং ছিল। এর বিপরীতে ২০২৬ সালের ঠিক একই সময়ে অর্থাৎ জুনে দৈনিক গড় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৭৪১ মেগাওয়াটে। ঘাটতির এই চিত্র স্পষ্ট করে যে, বৈশ্বিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বর্তমান বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা অতীতের তুলনায় কিছুটা হলেও স্থিতিশীল।
একইভাবে জুলাই মাসের পরিসংখ্যানও ইতিবাচক ধারাবাহিকতার চিত্র তুলে ধরে। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে গড়ে ৬১৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে বাধ্য হয়েছিল বিদ্যুৎ বিভাগ। তবে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সেই চিত্র আরও উন্নত হয়ে দৈনিক গড় ঘাটতি নেমে আসে ৪৬০ মেগাওয়াটে। অর্থাৎ বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর দেশের সার্বিক লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল।
তথ্যগুলো উপস্থাপন করে সরকারের এই নীতিনির্ধারক বোঝাতে চেয়েছেন যে, হঠাৎ করে গ্যাসের সরবরাহ বিঘ্নিত না হলে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরেও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অনেকটাই ভালো থাকত। সাময়িক এই গ্যাসের সংকট কাটাতে একাধিক কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফলে জনদুর্ভোগ স্থায়ী রূপ নেবে না বলেই সরকার বিশ্বাস করে।
শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের গৃহস্থালি জীবনের ওপর লোডশেডিংয়ের যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে সরকার অত্যন্ত সচেতন। বিশেষ করে দেশের রফতানিমুখী খাতগুলো যেন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পায়, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে। সাময়িকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ খাতে লোডশেডিং বাড়িয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর একটি কৌশলী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সচিবালয়ের এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও জ্বালানি খাতের সংস্কার নিয়ে কথা বলেন। দীর্ঘমেয়াদে কেবল আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভর না করে দেশীয় স্থলভাগ ও সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি না পেলে বারবার এমন সংকটের মুখোমুখি হতে হবে বলে সরকারের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে চলমান বিরূপ প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে উপদেষ্টা বলেন, প্রতিটি নাগরিকেরই ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সরকার সেই অধিকার নিশ্চিত করতেই কাজ করছে। কিন্তু বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের সংকট ও দেশে প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি এমন এক বাস্তবতা, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তাই সাময়িক এই কষ্টকে সহানুভূতির সঙ্গে দেখার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লোডশেডিংয়ের দরুন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় যে ব্যাঘাত ঘটছে, সরকার তার দ্রুত সুরাহা চায়। গ্যাসের বিকল্প উৎস সচল হলে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন যেমন বাড়ানো সম্ভব হবে, তেমনি বন্ধ থাকা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকেও পূর্ণ শক্তিতে ফিরিয়ে আনা যাবে। তখন ঢাকা কিংবা গ্রাম—কোথাও আর তীব্র লোডশেডিং থাকবে না।
সব মিলিয়ে, সচিবালয়ের বার্তায় এক ধরনের সতর্ক আশাবাদ ফুটে উঠেছে। প্রশাসনিক পর্যায়ে থেকে বাস্তবতাকে স্বীকার করে সমাধানের পথে হাঁটার এই চেষ্টা কত দ্রুত সফল হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়। গরমের এই তীব্রতার মাঝে দেশের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে গ্যাসের সংকট কেটে যাওয়ার সেই মুহূর্তটির জন্য, যখন আবার ঘরের আলো আর পাখার বাতাস মিলবে নিরবচ্ছিন্নভাবে।

