দেশের চলমান জ্বালানি সংকট কাটাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে প্রশাসন। বিকল্প সব উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনে সুদূর আফ্রিকা থেকেও জ্বালানি সংগ্রহ করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে শনিবার আয়োজিত এক সেমিনারে এই গুরুত্বপূর্ণ কথা জানান তিনি। ‘আসন্ন জাতিসংঘ সম্মেলন ও বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিং’ শীর্ষক ওই অনুষ্ঠানে দেশের অর্থনীতি ও কূটনীতির নানা দিক তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহের যে অস্থিরতা চলছে, তা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। এই বাস্তবতায় সরকার হাত গুটিয়ে বসে নেই। সম্ভাব্য প্রতিটি পথ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, দেশের মানুষের ঘরে আলো এবং কারখানায় উৎপাদন সচল রাখতে যা যা করা প্রয়োজন, সরকার সেটাই করবে। ঐতিহ্যগত বাজার ছাড়িয়ে নতুন ও অপ্রচলিত উৎসগুলোর দরজাও নাড়ছে ঢাকা।
তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে, জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রিতা চায় না বর্তমান প্রশাসন। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচে জ্বালানি আমদানির পুরোনো রুটগুলো যখন অনিশ্চয়তার মুখে, তখন নতুন এই ভাবনা দেশের অর্থনীতিকে স্বস্তি দিতে পারে।
আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, বৈশ্বিক এই মঞ্চে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে বহুমুখী পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
গত দেড় দশকে দেশের অর্থনীতি এক গভীর খাদের কিনারায় গিয়ে ঠেকেছিল। সেই ভঙ্গুর অর্থনীতিকে আবার সঠিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনা মুখের কথা নয়। এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট সময় ও কাঠামোগত সংস্কার।
প্রতিমন্ত্রী স্বীকার করেছেন যে রাতারাতি পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়। তবে নীতিনির্ধারকরা বসে নেই। ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম দূর করতে এরই মধ্যে কঠোর পদক্ষেপে গেছে সরকার।
বছরের পর বছর ধরে লুটপাটের শিকার হয়ে ফানুসের মতো ফুলে ওঠা ব্যাংকিং খাতকে এখন নিয়মের মধ্যে আনার চেষ্টা চলছে। খেলাপি ঋণ আদায় এবং সুশাসন ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো একযোগে কাজ করছে।
রাষ্ট্রের প্রতিটি খাতে গুণগত পরিবর্তনের একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা নিয়ে এগোচ্ছে প্রশাসন। তবে এই সংস্কার প্রক্রিয়ার সুফল পেতে দেশবাসীকে আরও কিছু সময় ধৈর্য ধরতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে চলা জটিলতা দূর করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে সরকার বদ্ধপরিকর।
লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে ব্যবসা সহজীকরণের প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করা হচ্ছে। কারণ বৈদেশিক বিনিয়োগ ছাড়া এই স্থবির অর্থনীতিকে সচল করা প্রায় অসম্ভব।
অনুষ্ঠানে অবৈধ অভিবাসনের বিষয়টিও অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। মানবপাচার ও অনিয়মিত অভিবাসন রোধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সঙ্গে সমন্বয় করে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বৈধ পথে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর ক্ষেত্রগুলো প্রসারিত করার পাশাপাশি দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় এই অবৈধ স্রোত থামানো এখন সময়ের দাবি।
এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের চলমান সংঘাতে রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। নতুন করে সীমান্ত পেরিয়ে মানুষের আসার চাপ পরিস্থিতিকে আরও বেশি ঘনীভূত করেছে।
আসন্ন জাতিসংঘ সম্মেলনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি আলাদা ও বিশেষ সেশন অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই মানবিক সংকটের স্থায়ী সমাধানের তাগিদ দেওয়া হবে সেখানে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেবল অভ্যন্তরীণ সদিচ্ছা দিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন জোরালো আন্তর্জাতিক চাপ।
মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখতে বিশ্বনেতাদের দরবারে জোরালো ভূমিকা রাখবে বাংলাদেশ। দীর্ঘমেয়াদি এই সংকটের কারণে স্থানীয় অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তাও তুলে ধরা হবে জাতিসংঘে।
সব মিলিয়ে এক বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে সময় পার করছে দেশ। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে অর্থনীতি চাঙ্গা করা এবং কূটনীতির মাঠে অধিকার আদায়—সবক্ষেত্রেই নতুন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।

