রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের লুই আই কানের নকশা করা সেই চেনা লাল ইটের ইমারতটি আবার মুখরিত হতে যাচ্ছে। নতুন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন আর নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় ও প্রথম অগ্নিপরীক্ষা শুরু হচ্ছে আগামীকাল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় এবং এই সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন বসছে রোববার (৭জুন)। বিকেল ৩টায় স্পিকারের হাতুড়ির আওয়াজে শুরু হবে এই ঐতিহাসিক সংসদীয় কার্যক্রম।
অর্থনৈতিক নানা টানাপোড়েন আর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার পারদ যখন তুঙ্গে, তখন এই অধিবেশনকে ঘিরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে চলছে তুমুল আলোচনা। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে গত মে মাসে এই গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন আহ্বান করেছিলেন। মূলত এই অধিবেশনেই নতুন অর্থবছরের জন্য সরকারের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও বিশাল ব্যয়ের রূপরেখা বা জাতীয় বাজেট পেশ ও পাস করা হবে।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির পর থেকেই পুরো সংসদ ভবন এলাকা জুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আইনপ্রণেতাদের আসন বণ্টন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য পাস ইস্যু করাসহ যাবতীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এবারের অধিবেশনটি দীর্ঘ হতে পারে, কারণ নতুন বাজেটের ওপর বিস্তারিত সাধারণ আলোচনায় অংশ নেবেন সব দলের সংসদ সদস্যরা।
নতুন অর্থনৈতিক পথনকশার অপেক্ষা
এর আগে গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম ঐতিহাসিক অধিবেশন বসেছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমার পর নতুন এমপিদের শপথ আর স্পিকার নির্বাচনসহ নানাবিধ সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেই অধিবেশন শেষ হয় গত ৩০ এপ্রিল। প্রথম অধিবেশনে সরকারের প্রাথমিক কার্যক্রম গোছানোর দিকেই বেশি মনোযোগ ছিল। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন; এবার আলোচনা হবে খোদ দেশের মানুষের পকেটের টাকা আর উন্নয়ন দর্শনের হিসাব নিয়ে।
প্রতি বছর জুন মাসে দেশের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে যে বিশেষ সংসদ অধিবেশন বসে, তা রাজনৈতিক পরিভাষায় বাজেট অধিবেশন নামে পরিচিত। তবে এবারের বাজেটটি শুধু একটি বার্ষিক রুটিন কাজ নয়। এটিকে দেখা হচ্ছে নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও অর্থনৈতিক দর্শনের প্রথম বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে। দেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রিজার্ভ সংকট মোকাবিলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো জটিল চ্যালেঞ্জগুলো এই বাজেটে কীভাবে সমাধান করা হয়, তা দেখতে মুখিয়ে আছে পুরো দেশ।
সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ৭ মে জ্যেষ্ঠ সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়ার স্বাক্ষরে এই অধিবেশন শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো এবং অর্থ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করেছে এই বাজেট প্রস্তাবনাকে চূড়ান্ত রূপ দিতে। দেশের ব্যবসায়ী সমাজ, সুশীল সমাজ ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ—সবার চোখ এখন রোববারের এই অধিবেশন কক্ষের দিকে।
দীর্ঘ বিতর্কের পর পাস হবে নতুন বাজেট
রোববার অধিবেশন শুরু হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী শোক প্রস্তাব ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুরু হবে মূল কার্যদিবস। সংসদীয় রেওয়াজ অনুযায়ী, অধিবেশনের শুরুর দিকেই নতুন অর্থবছরের জন্য সরকারের অর্থমন্ত্রী তার প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট প্রস্তাবনাটি পেশ করবেন। যেখানে আগামী এক বছরের জন্য কর কাঠামো, মেগা প্রকল্পের বরাদ্দ এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নতুন ঘোষণা আসবে।
বাজেট উপস্থাপনের পর শুরু হবে এর ওপর দীর্ঘ ও চুলচেরা বিশ্লেষণ। সরকারি ও বিরোধী দলসহ অন্যান্য স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকার উন্নয়ন আর সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতির পক্ষে-বিপক্ষে নিজেদের মতামত তুলে ধরবেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই দীর্ঘ বিতর্কের পর, জুনের শেষ সপ্তাহে কণ্ঠভোটে পাস হবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই নতুন বাজেট। ১ জুলাই থেকে যা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে।
শেরে বাংলা নগরের সংসদ ভবনের ভেতরে যখন নীতিনির্ধারকেরা দেশের ভাগ্য নির্ধারণী বাজেট নিয়ে আলোচনা করবেন, তখন বাইরে সাধারণ মানুষের মনে থাকবে একরাশ প্রত্যাশা। নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম আর করের বোঝা থেকে মুক্তি মিলবে কিনা, সেই উত্তর লুকিয়ে আছে এই ত্রয়োদশ সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ভেতর। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন কেবল খাতা-কলমের হিসাব নয়, বরং দেশের কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মান নির্ধারণের এক অনন্য মঞ্চ হতে যাচ্ছে।

