আকাশের বুক চিরে মেঘের ঘনঘটা জানান দিচ্ছে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বর্ষার আগমনী বার্তা। গুমোট গরমের পর মেঘের এই আনাগোনা নগরজীবনে কিছুটা স্বস্তি আনলেও, একই সঙ্গে তা ডেকে আনছে জলাবদ্ধতা আর ভোগান্তির আশঙ্কা। দেশের সীমান্ত পেরিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমীবায়ু এবার দেশের অভ্যন্তরে নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেছে।
আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, প্রকৃতিতে এখন পরিবর্তনের হাওয়া। টেকনাফ ও চট্টগ্রাম উপকূল পেরিয়ে এই মৌসুমী বায়ু বা বর্ষা পরিস্থিতি এখন দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তা বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল তথা রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার জন্য একেবারে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের আবহাওয়ার ওপর। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এক জরুরি পূর্বাভাসে জানিয়েছে, আগামী পাঁচ দিন দেশের রাজধানী ঢাকাসহ প্রায় সব বিভাগেই অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। সেই সঙ্গে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টির দাপট দেখা যাবে।
উপকূল ছাড়িয়ে মধ্যাঞ্চলে মৌসুমী বায়ু
শনিবার (৬ জুন) সন্ধ্যায় দেওয়া এক বিশেষ বুলেটিনে আবহাওয়াবিদ ড. মো. ওমর ফারুক জানান, বর্ষা এখন পুরোপুরি সক্রিয় হওয়ার পথে। চাটগাঁর পাহাড়ী অঞ্চল পেরিয়ে মেঘের দল এখন দেশের ভেতরের দিকে এগোচ্ছে। এর ফলে নদীমাতৃক এই ভূখণ্ডের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে।
সাধারণত জুনের এই সময়ে এসে বর্ষার চেনা রূপ দেখা যায়। তবে এবারের মৌসুমী বায়ুর সক্রিয়তা কিছুটা ভিন্ন মাত্রা যোগ করছে। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় মেঘের ঘনত্ব দ্রুত বাড়ছে। ফলে আকস্মিক দমকা হাওয়া এবং বজ্রপাতের প্রবণতাও এবার বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
আবহাওয়া অফিসের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ বলছে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় বৃষ্টি নামবে। বাদ যাবে না উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলও। রংপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে ঝড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ বৃষ্টি হতে পারে।
তাপমাত্রার ওঠানামা ও নাগরিক স্বস্তি
মেঘ-বৃষ্টির এই লুকোচুরি খেলার কারণে সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে। তবে রাতের তাপমাত্রায় খুব একটা হেরফের হবে না বলেই মনে করছেন আবহাওয়াবিদেরা। গুমোট ও ভ্যাপসা গরমের পর এই সামান্য তাপমাত্রা হ্রাসও সাধারণ মানুষের জন্য বড় স্বস্তি হয়ে এসেছে।
বিশেষ করে ঢাকার মতো জনবহুল মেগাসিটিতে, যেখানে কংক্রিটের উত্তাপ জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে, সেখানে এই বৃষ্টির পূর্বাভাস কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ দিচ্ছে। তবে এই স্বস্তির পেছনে লুকিয়ে আছে ঢাকার চিরচেনা জলাবদ্ধতার এক নির্মম ও কঠিন বাস্তব চিত্র।
রবিবার (৭ জুন) সন্ধ্যা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসেও বৃষ্টির এই ধারা বজায় থাকার কথা বলা হয়েছে। এ সময়ে ময়মনসিংহ, ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামতে পারে। অন্যদিকে রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় দমকা হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
সপ্তাহের মাঝামাঝিতে প্রকৃতির ভিন্ন রূপ
সোমবার (৮ জুন) থেকে আবহাওয়া পরিস্থিতির সামান্য পরিবর্তন হতে পারে। এদিন সন্ধ্যা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় বৃষ্টি হতে পারে। তবে রাজশাহী বিভাগে বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমে স্রেফ দু-এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
এই সামান্য বিরতির কারণে সোমবার সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা আবার কিছুটা বাড়তে পারে। তবে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় গরমের অনুভূতি এখনই কমছে না। রাতের তাপমাত্রা অবশ্য প্রায় অপরিবর্তিত থাকবে। ফলে রাতের বেলা খুব একটা গরম অনুভব নাও হতে পারে।
আসল দাপট শুরু হতে পারে সপ্তাহের মাঝামাঝিতে, অর্থাৎ মঙ্গলবার (৯ জুন) থেকে। আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্ক করেছে যে, এদিন থেকে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা আবার বহুগুণ বেড়ে যাবে। রংপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
অতি ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার শঙ্কা
মঙ্গলবারের এই অতি ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস নিয়ে চিন্তিত নগর পরিকল্পনাবিদেরা। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে যেখানে ড্রেনেজ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক, সেখানে কয়েক ঘণ্টার অতি ভারী বর্ষণেই রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। ফলে অফিসগামী মানুষ ও সাধারণ পথচারীদের জন্য এই দিনটি বেশ ঝামেলার হতে পারে।
একই সঙ্গে দেশের পাহাড়ী অঞ্চলগুলোতে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেটে ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড় ধসের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। প্রশাসনকে ইতোমধ্যে এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাড়তি নজরদারি রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। নদী তীরবর্তী নিচু এলাকাগুলোও প্লাবিত হতে পারে।
বুধবার (১০ জুন) সন্ধ্যা পর্যন্ত বৃষ্টির এই রাজত্ব জারি থাকবে। এদিন রংপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের দু-এক জায়গায় বজ্রসহ বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এদিন সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা আবারও সামান্য বাড়তে পারে।
পাঁচ দিনের শেষে আরও বড় দুর্যোগের আভাস
তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আবহাওয়া অধিদপ্তর তাদের পাঁচ দিনের পূর্বাভাসের শেষের দিকে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা আরও বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছে। এর অর্থ হলো, জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে বর্ষা তার পূর্ণ রূপ ধারণ করবে এবং দেশজুড়ে একটানা বৃষ্টিপাতের এক দীর্ঘ স্পেল বা সময়কাল শুরু হতে পারে।
কৃষিপ্রধান এই দেশে বর্ষার বৃষ্টি আশীর্বাদ হলেও, অতি বৃষ্টি ফসলের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে নিচু এলাকার ফসলী জমি তলিয়ে যাওয়ার একটা ঝুঁকি থেকেই যায়। কৃষকদের তাই এই আবহাওয়ার পূর্বাভাসের দিকে কড়া নজর রাখার এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রকৃতির এই অমোঘ নিয়মকে মেনে নিয়েই নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষকে পথ চলতে হয়। একদিকে বৃষ্টির সতেজতায় সবুজ হয়ে উঠবে চারপাশ, অন্যদিকে নদীভাঙন আর জলাবদ্ধতার লড়াই। মৌসুমী বায়ুর এই সক্রিয়তা আগামী দিনগুলোতে দেশের জনজীবনকে কতটা প্রভাবিত করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

