একটি রাষ্ট্র যখন এক গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন করে পথ চলতে শুরু করে, তখন তার পর্দার আড়ালে কী ঘটে? ক্ষমতার অলিন্দে কারা বসেন নীতিনির্ধারণী আসনে? এসব চিরন্তন রাজনৈতিক জিজ্ঞাসার এক চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক উত্তর নিয়ে হাজির হয়েছেন সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।
তার দাবি, সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে চলেনি। বরং সাত সদস্যের একটি শক্তিশালী ও অদৃশ্য ‘কিচেন কেবিনেট’ বা অভ্যন্তরীণ চক্রের ইশারায় পরিচালিত হতো পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র। এই প্রভাবশালী চক্রের ক্রমাগত অনধিকার চর্চা ও মন্ত্রণালয়ের কাজে হস্তক্ষেপের কারণে তিনি গভীর হতাশায় ভুগেছিলেন।
এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই অভিজ্ঞ কূটনীতিক জানিয়েছেন, ক্ষমতার ভেতরে থাকা এই অদৃশ্য চক্রের একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে তিনি দায়িত্ব পালনকালীন অন্তত তিনবার পদত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে শেষ মুহূর্তে রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থ এবং সরকারের সম্ভাব্য ভাবমূর্তি সংকটের কথা বিবেচনা করে তিনি পিছু হটেন।
যমুনার গোপন বৈঠক ও অনভিজ্ঞদের আধিপত্য
তৌহিদ হোসেন সরকারের ভেতরের সেই টানাপোড়েনের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন। তিনি জানান, রাষ্ট্রীয় সংস্কারের মূল দায়িত্ব যাদের হাতে থাকার কথা ছিল, তাদের পাশ কাটিয়ে একদল অনভিজ্ঞ ব্যক্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিল।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্রীয় নীতি ও কৌশল নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আসলে কেবিনেট সভায় হতো না। এগুলো নেওয়া হতো একটি নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে। আমি নিজে একবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনাতে তাদের একটি গোপন বৈঠকে উপস্থিত হয়েছিলাম। পরে জানতে পারি, প্রতি মঙ্গলবার তারা সেখানে নিয়মিত বসতেন।”
সাবেক এই উপদেষ্টা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এই কিচেন কেবিনেটের সদস্যদের রাষ্ট্র পরিচালনার বা দীর্ঘমেয়াদি কূটনীতির কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তা সত্ত্বেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রতিটি স্তরে তাদের মতামতকে অতিরিক্ত এবং অযাচিত গুরুত্ব দেওয়া হতো, যা অনেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার জন্য ছিল চরম অস্বস্তিকর।
ডিপ স্টেট ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেপথ্য শক্তি
গত বছরের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পেছনে কোনো ‘ডিপ স্টেট’ বা আন্তর্জাতিক কোনো অদৃশ্য শক্তির হাত ছিল কিনা—এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে সাবেক এই পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে।
তৌহিদ হোসেন এই বিষয়ে কোনো রাখঢাক না রেখেই বলেন, “ডিপ স্টেট বা অদৃশ্য শক্তির অস্তিত্ব পৃথিবীর প্রায় সব বড় রাজনৈতিক ঘটনার সাথেই কমবেশি যুক্ত থাকে। তারা সাধারণত ইতিহাসের মূল স্রোতের বিপরীতে গিয়ে কোনো যুদ্ধ বা আন্দোলন তৈরি করে না। তবে স্রোত যখন তৈরি হয়, তখন তারা তার সাথে মিশে যায়।”
তিনি আরও যোগ করেন, এই অদৃশ্য শক্তিগুলো গণআকাঙ্ক্ষাকে নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য পরিস্থিতি ম্যানিপুলেট বা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি বলেই তার ধারণা, যা সময়ের সাথে সাথে আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
অন্ধকারে রাখা হয়েছিল খোদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে
রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিভাগগুলোর একটি হলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অথচ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা এই খোদ মন্ত্রণালয়টিকেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হতো বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তৌহিদ হোসেন।
সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে তিনি জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত একটি বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তির কথা উল্লেখ করেন। এই চুক্তিটি নিয়ে সে সময় আন্তর্জাতিক মহলে এবং দেশের ভেতরে ব্যাপক সমালোচনা ও নানামুখী গুঞ্জন তৈরি হয়েছিল।
সাবেক উপদেষ্টা বলেন, “আমি অত্যন্ত দায়িত্ব নিয়ে বলছি, এই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির সাথে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামান্যতমও কোনো সংযোগ বা সম্পৃক্ততা ছিল না। পুরো প্রক্রিয়াটি পর্দার আড়ালে সম্পন্ন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার কার্যালয়।”
নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই ছিল সমীচীন
একটি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক চুক্তি সই করার যৌক্তিকতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল। তৌহিদ হোসেনও মনে করেন, এই ধরণের বড় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করা ঠিক হয়নি।
তিনি বলেন, “যদি কোনো আন্তর্জাতিক বা আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকত, তবে এই চুক্তিটি সই করার বিষয়টি দেশের একটি নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই সবচেয়ে সংগত ও যথাযথ ছিল। কিন্তু পর্দার পেছনের কুশীলቦች তা হতে দেয়নি।”
মন্ত্রণালয়ের প্রধান হয়েও এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজের মতামত দিতে না পারা বা সিদ্ধান্তের বাইরে থাকা একজন পেশাদার কূটনীতিকের জন্য কতটা অপমানজনক ও কষ্টের ছিল, তৌহিদ হোসেনের কণ্ঠস্বরে সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট ছিল। এই ধরণের ঘটনাই তাকে বারবার পদত্যাগের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও দিল্লির কূটনৈতিক বাস্তবতা
টানা দেড় দশক রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি দেশের রাজনীতিতে বড় আলোচনার বিষয়। অন্তর্বর্তী সরকার তাকে ফেরত চেয়ে দিল্লিকে আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠিয়েছিল।
তবে এই চিঠি পাঠানোর মূল কার্যকারিতা নিয়ে খোদ তৌহিদ হোসেনের মনেই ছিল গভীর সংশয়। তিনি অকপটে স্বীকার করেন, দিল্লি যে শেখ হাসিনাকে এত সহজে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেবে না, এই কূটনৈতিক বাস্তবতার কথা তিনি প্রথম থেকেই খুব ভালো করে জানতেন।
তার ভাষায়, “আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কিছু অলিখিত প্রথা থাকে। আমি জানতাম এই চিঠির ফলাফল শূন্য হবে। কিন্তু দেশের ভেতরের জনআকাঙ্ক্ষা এবং প্রথাগত কূটনৈতিক তৎপরতা বজায় রাখার স্বার্থেই আমাদের সেই আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করতে হয়েছিল।”
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও জনস্মৃতি
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর তীব্র জনরোষের মুখে পড়া এবং আইনি নিষেধাজ্ঞার খড়গের নিচে থাকা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও নিজের খোলামেলা মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন সাবেক এই উপদেষ্টা। তিনি মনে করেন না যে এই দলটি চিরতরে হারিয়ে যাবে।
তৌহিদ হোসেন বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আওয়ামী লীগ এ দেশের রাজনীতি থেকে একেবারে শেষ হয়ে যাবে না বা মুছে যাবে না। আমাদের দেশের মানুষের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তাদের রাজনৈতিক স্মৃতিশক্তি খুব বেশি দীর্ঘ নয়। তারা দ্রুত অতীত ভুলে যায়।”
তিনি অনুমান প্রকাশ করে বলেন, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হলেও তৃণমূলের সমর্থক গোষ্ঠী ঠিকই টিকে থাকবে। আর এই জনস্মৃতির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আগামী জাতীয় নির্বাচনেই হয়তো দলটিকে আবার সম্পূর্ণ নতুন কৌশলে অংশ নিতে দেখা যেতে পারে।
নতুন সমীকরণ ও তারেক রহমানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বর্তমান দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে ক্ষমতার অন্যতম প্রধান দাবিদার বিএনপি এবং তার শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়ে এই মুহূর্তে খুব বেশি মন্তব্য করতে রাজি হননি তৌহিদ হোসেন। তিনি মনে করেন, মাঠের রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে।
তবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ভূরাজনীতি ও নতুন সরকারের নেতৃত্ব নিয়ে একটি বিশেষ দিক নির্দেশ করেছেন তিনি। তার মতে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জন্য আগামী দিনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
তৌহিদ হোসেন বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারতের মতো তিনটি পরাক্রমশালী ও প্রভাবশালী দেশের সাথে সমান কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে আগামী দিনের নেতৃত্বের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। কোনো একদিকে বেশি ঝুঁকে পড়লে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা সংকটে পড়তে পারে।”
পর্দার আড়ালের সত্যের মুখোমুখি দেশ
তৌহিদ হোসেনের এই দীর্ঘ ও অকপট সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একটি অন্তর্বর্তী সরকার, যা কিনা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতীক হওয়ার কথা ছিল, তার ভেতরেও যে এমন ক্ষমতার খেলা চলেছে, তা সাধারণ মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে।
কিচেন কেবিনেটের এই অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি এবং জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের অন্ধকারে রাখার সংস্কৃতি প্রমাণ করে যে, ক্ষমতার চরিত্র সব জমানায় প্রায় একই রকম থাকে। দৃশ্যপটের পরিবর্তন হলেও ভেতরের অদৃশ্য সুতোর টানগুলো সহজে আলগা হয় না।
বিশ্লেষকদের মতে, তৌহিদ হোসেনের এই স্বীকারোক্তি আগামী দিনের রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। রাষ্ট্রকে যদি সত্যিই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হয়, তবে এমন গোপন কেবিনেট সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে সব সিদ্ধান্তকে জনগণের সামনে আনা জরুরি। তা না হলে, কোনো গণঅভ্যুত্থানের সুফলই শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাবে না।

