হাসপাতালের করিডোরে চাদরে ঢাকা ছোট একটি শরীর আঁকড়ে ধরে কাঁদছেন এক মা। পাশেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বাবা। ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের এই চেনা দৃশ্যটি এখন কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশজুড়ে নীরবে ছড়িয়ে পড়া এক সংক্রামক ব্যাধির নির্মম বাস্তবতার প্রতীক এটি। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিশুদের তীব্র জ্বর, শরীরে লালচে র্যাশ আর শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণগুলো চিকিৎসকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে দিয়েছে।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে হাম ও এর সদৃশ উপসর্গের প্রকোপ। পরিস্থিতি যে কতটা জটিল রূপ নিচ্ছে, তা স্পষ্ট হয়েছে সরকারের সর্বশেষ দাপ্তরিক পরিসংখ্যানে। শেষ চব্বিশ ঘণ্টাতেও দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছে আরও ১৭টি শিশু। একই সময়ে নতুন করে এই ভাইরাসের থাবায় আক্রান্ত হয়েছে এক হাজারেরও বেশি শিশু।
সোমবার (২৫ মে) বিকেলে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ নিয়মিত প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে। সরকারি এই পরিসংখ্যানের বাইরেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, যাদের একটি বড় অংশই হাসপাতালের হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে ধারণা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
মৃত্যুর মিছিল ও উপসর্গের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ঝুঁকি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত দুই মাসেরও কম সময়ে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা সাড়ে পাঁচশ ছুঁইছুঁই। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত মোট ৫৪৫টি শিশু মারা গেছে। তবে এই মৃত্যুর সবগুলোকে সরাসরি হামের কারণে বলে এখনই নিশ্চিত করতে পারছেন না চিকিৎসকেরা।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি মেলার পর মারা গেছে ৮৭ জন শিশু। অন্যদিকে, বাকি ৪৫৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে। সাধারণত প্রত্যন্ত এলাকায় পরীক্ষার সুযোগ কম থাকায় এবং হাসপাতালে আনার আগেই পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় মৃত্যুর ধরণ নিশ্চিত করতে সময় লাগছে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, অনেক সময় হামের মূল লক্ষণগুলো প্রকাশ পাওয়ার পর নিউমোনিয়া বা তীব্র ডায়রিয়ার মতো জটিলতা তৈরি হয়। আর এই সহযোগী রোগগুলোর কারণেই মূলত শিশুরা দ্রুত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে আরও বিস্তারিত ক্লিনিক্যাল পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
আক্রান্তের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী: হাসপাতালের বেডে ঠাঁই নেই
ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া এবং কেবল উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা—দুই ক্যাটাগরিতেই রোগীর সংখ্যা প্রতিদিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে নতুন করে আরও ১ হাজার ২২৪টি শিশুর শরীরে এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে।
সরকারি খতিয়ান অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহে সারা দেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৮ হাজার ৭১৯ জন শিশু। এই রোগীরা প্রত্যেকেই রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে পজিটিভ প্রমাণিত হয়েছে। তবে এর চেয়েও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে উপসর্গধারী বিশাল রোগীর সংখ্যা।
এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ এবং জরুরি বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে ৬৪ হাজার ৯৪০ জন শিশু। বিপুল সংখ্যক এই রোগীর চাপে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ডে তিল ধারণের জায়গা নেই। এক বেডেই একাধিক শিশুকে রেখে চিকিৎসা দিতে বাধ্য হচ্ছেন নার্স ও চিকিৎসকেরা।
সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে রাজধানী ও ঢাকা বিভাগ
এবারের হামের প্রকোপে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ঢাকা বিভাগ সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত। ঘনবসতি এবং অসচেতনতার কারণে এই অঞ্চলে ভাইরাসের বিস্তার ঘটেছে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে। মোট আক্রান্ত ও মৃত্যুর অর্ধেকের কাছাকাছি রেকর্ড করা হয়েছে কেবল এই একটি বিভাগেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন বলছে, ঢাকা বিভাগে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে এখন পর্যন্ত ২৩১টি শিশু প্রাণ হারিয়েছে। একই সঙ্গে এই বিভাগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৭০৬ জনে। ঢাকার বড় বড় শিশু হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন সকাল থেকেই বহির্বিভাগে মায়েদের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার বস্তি এলাকা এবং নিম্নআয়ের মানুষের বসবাসের জায়গাগুলোতে পুষ্টিহীনতা এবং টিকাদানের হারের ঘাটতি রয়েছে। এই কারণে এসব এলাকায় ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর তা দ্রুত মহামারি আকার ধারণ করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
বসন্তের শেষভাগে আকস্মিক প্রাদুর্ভাবের সময়কাল
সরকারিভাবে এই বিশেষ সংকটের হিসাব রাখা শুরু হয়েছে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে। মূলত গত ১৫ মার্চ সকাল ৮টা থেকে শুরু করে আজ ২৫ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় ৭০ দিনের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
গ্রীষ্মের এই খরতাপের মাঝে কেন হঠাৎ করে হামের মতো একটি শীত ও বসন্তকালীন রোগের প্রকোপ এত বাড়ল, তা নিয়ে জনস্বাস্থ্য গবেষকদের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং বাতাসে আর্দ্রতার আকস্মিক তারতম্য ভাইরাসের টিকে থাকার ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, কোনো এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দ্রুততম সময়ে সেখানে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি বা ‘মপ-আপ ক্যাম্পেইন’ পরিচালনা করতে হয়। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশের ঝুঁকিপূর্ণ পকেটগুলোতে অতিরিক্ত ইপিআই টিম পাঠানোর কাজ শুরু করেছে।
মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ও চিকিৎসকদের উদ্বেগ
ঢাকার একটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ডা. আহমেদ হোসেন জানান, গত এক সপ্তাহে তাদের হাসপাতালে আসা প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৩ জনের শরীরেই হামের স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা বিষয়টিকে সাধারণ জ্বর মনে করে অবহেলা করছেন।
তিনি বলেন, “হাম হলে সাধারণত ৪-৫ দিন তীব্র জ্বর থাকে এবং চোখ লাল হয়ে পানি পড়ে। এরপর মুখমণ্ডল থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ দেখা দেয়। এই সময়ে শিশুকে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ দেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।”
মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা জানাচ্ছেন, অনেক গ্রামীণ এলাকায় এখনো হাম হলে কবিরাজি চিকিৎসা বা ঝাড়ফুঁকের ওপর ভরসা করার প্রবণতা রয়েছে। শিশুকে ঘরের অন্ধকার কোণে আটকে রাখা এবং মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দেওয়ার মতো কুসংস্কারের কারণে অনেক শিশু পুষ্টিহীনতায় ভুগে মারা যাচ্ছে।
টিকাদানের ঘাটতি ও ভবিষ্যৎ প্রতিরোধ পরিকল্পনা
হাম মূলত একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় শিশুদের নিয়মিত ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ হাম-রুবেলার (এমআর) টিকা দেওয়া হয়। তবে করোনা মহামারি এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক শিশু এই নিয়মিত ডোজ থেকে বাদ পড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, দেশের কিছু দুর্গম অঞ্চল এবং চরাঞ্চলে টিকাদানের কভারেজ শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বাদ পড়া এই শিশুরাই এখন ভাইরাসের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। একটি শিশু আক্রান্ত হলে তার মাধ্যমে আশপাশের আরও ১০-১২টি শিশু সংক্রমিত হতে পারে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জরুরি ভিত্তিতে হামের প্রতিষেধক টিকার নতুন মজুত নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে মাঠকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের তালিকা তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে কাউকেই এই সুরক্ষার বাইরে রাখা না হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শ, আতঙ্কিত না হয়ে শিশুর জ্বর হলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যোগাযোগ করাই এই সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র পথ।

