জাতীয় দিগন্তে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মহান বিজয় দিবসেই ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত তৃতীয় বা থার্ড টার্মিনালটি আনুষ্ঠানিকভাবে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
সোমবার (২৫ মে) বর্তমান সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম ‘১০০ দিন পূর্তি’ উপলক্ষে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহাদী আমিন সরকারের এই মেগা প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন।
রাজধানীতে আয়োজিত এই বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে বিগত একশো দিনে প্রশাসনের নেওয়া নানা জনমুখী ও দূরদর্শী উদ্যোগের একটি সামগ্রিক খতিয়ান উপস্থাপন করা হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পটপরিবর্তনের পর বর্তমান সরকার তাদের কাজের গতি এবং আন্তরিকতা প্রমাণে এই আয়োজন করে।
মেগা প্রকল্প সচল রাখার প্রত্যয়
উপদেষ্টা মাহাদী আমিন বলেন, দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে এবং বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে থার্ড টার্মিনালের কাজকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্প এলাকায় দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা দ্রুতগতিতে নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে।
তিনি উল্লেখ করেন, এই টার্মিনালটি চালু হলে শাহজালাল বিমানবন্দরের যাত্রী ও কার্গো ধারণক্ষমতা প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পাবে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন এই অবকাঠামোটি বিদেশি বিনিয়োগ ও পর্যটনে এক নতুন যুগের সূচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, কেবল বিমানবন্দরই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক যোগাযোগ ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিতে সরকার একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত একটি বিস্তীর্ণ ইকোনমিক করিডোর বাস্তবায়নের প্রাথমিক প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।
যুব সমাজ ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন
বর্তমান সরকার তরুণ সমাজকে দেশের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। সংবাদ সম্মেলনে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য এক বড় সুখবর দেওয়া হয়েছে। মাহাদী আমিন জানান, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের যে ব্যাংক গ্যারান্টির জটিলতায় পড়তে হতো, সেই সুবিধা আরও সম্প্রসারণ ও সহজ করা হয়েছে।
পাশাপাশি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে দেশের গণপরিবহন ও ট্রানজিট পয়েন্টগুলোতে বড় ধরণের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে। দেশের প্রধান বিমানবন্দরগুলো এবং দূরপাল্লার আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে যাত্রীদের জন্য হাই-স্পিড ফ্রি ওয়াই-ফাই সেবা চালু করা হয়েছে।
প্রযুক্তির এই সম্প্রসারণের পাশাপাশি তরুণদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তৃণমূল পর্যায় থেকে ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণ ও বিকাশের লক্ষ্যে নতুন আঙ্গিকে দেশজুড়ে ‘স্পোর্টস ও নতুন কুঁড়ি’ কার্যক্রম পুনরায় চালু করেছে সরকার।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে মানবিক উদ্যোগ
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিগত একশো দিনে স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারে সরকার বেশ কিছু দ্রুত ও মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করতে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচিতে বড় সাফল্য এসেছে। অতি সম্প্রতি জরুরি ভিত্তিতে হামের টিকা আমদানি করে দেশের প্রায় শতভাগ শিশুকে এর আওতাভুক্ত করা হয়েছে।
শ্রমজীবী ও চাকরিজীবী মায়েদের জন্য একটি যুগান্তকারী সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে বর্তমান সরকার। নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে মায়েরা নবজাতকের যত্নে আরও বেশি সময় পাবেন, যা শিশুর সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখবে।
স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য সরকার বাজেটের কাঠামোতে বড় পরিবর্তনের আভাস দিয়েছে। উপদেষ্টা মাহাদী আমিন দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, দেশের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পর্যায়ক্রমে বার্ষিক জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ এই খাতে নিশ্চিত করার ঐতিহাসিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
স্বল্প সময়ে মন্ত্রিসভার কাজের খতিয়ান
বিগত সরকারের আমলের গুম-খুন, ঢালাও হামলা-মামলা এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের এক দীর্ঘ ও অন্ধকার পথ অতিক্রম করে বর্তমান সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত এই সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম একশো দিনের পারফরম্যান্স বেশ আশাব্যঞ্জক বলে দাবি করা হয়।
সরকারি হিসাব মতে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি কার্যভার গ্রহণের পর থেকে ২৪ মে পর্যন্ত বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভা মোট ১০টি গুরুত্বপূর্ণ কেবিনেট সভা সম্পন্ন করেছে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সর্বসম্মতিক্রমে ৬০টি বড় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
গৃহীত এই সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে ইতিমধ্যেই ৩৭টি সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত ও মাঠ পর্যায়ে কার্যকর করা হয়েছে, যা মোট সিদ্ধান্তের প্রায় ৬২ শতাংশ। এছাড়া বাকি ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে দ্রুত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
কার্যকারিতা ও আন্তরিকতার এক অনন্য নজির
উপদেষ্টা মাহাদী আমিন মন্তব্য করেন, সরকার গঠনের পর এত স্বল্প সময়ের মধ্যে মন্ত্রিসভায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর সিংহভাগ কার্যকর করতে সক্ষম হওয়া একটি বিরল ঘটনা। এটি বর্তমান প্রশাসনের কাজের গতি, প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা এবং জনগণের প্রতি আন্তরিকতার এক উজ্জ্বল ও স্পষ্ট দৃষ্টান্ত।
তিনি বলেন, “আমরা কেবল বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় বিশ্বাসী নই। আমাদের কাজের মূল লক্ষ্য হলো জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের সুফল যেন দেশের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা।” আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে কাজের গতি বাড়াতে সব মন্ত্রণালয়কে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেসসচিব আতিকুর রহমান রুমন সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ওপর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সাবলীলভাবে সঞ্চালনা করেন উপ-প্রেসসচিব জাহিদুল ইসলাম রনি।
সমন্বিত উন্নয়ন ও প্রশাসনের উপস্থিতি
একশো দিন পূর্তির এই গুরুত্বপূর্ণ মাহেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও প্রেস উইংয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রধান স্পিচ রাইটার এস এ এম মাহফুজুর রহমান, যিনি সরকারের মূল ভাবাদর্শ ও নীতি তৈরিতে কাজ করছেন।
এছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন উপ-প্রেসসচিব হাসান শিপলু, সুজাউদ্দৌলা সুজন এবং শাহদাৎ হোসেন স্বাধীনসহ সরকারের বিভিন্ন পদস্থ আমলা ও নীতিনির্ধারকবৃন্দ। তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ বিভাগের বিগত তিন মাসের কাজের অগ্রগতি সাংবাদিকদের সামনে মৌখিকভাবে ব্যাখ্যা করেন।
সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র মাহাদী আমিন বলেন, “একটি বিধ্বস্ত শাসনব্যবস্থা থেকে দেশকে সঠিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনা সহজ ছিল না। তবে প্রথম ১০০ দিনে আমরা যে ভিত্তি তৈরি করেছি, তা আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশকে একটি স্বনির্ভর ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।”
ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা
বিশ্লেষকদের মতে, ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে থার্ড টার্মিনাল চালুর এই ডেডলাইন বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরীক্ষা। যদি এই মেগা প্রজেক্টটি নির্ধারিত সময়ে আলোর মুখ দেখে, তবে তা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরণের ইতিবাচক মোড় নিয়ে আসবে।
ইকোনমিক করিডোর ও জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রশাসনের ধারাবাহিক স্বচ্ছতা।
সংবাদ সম্মেলন শেষে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের ধন্যবাদ জানানো হয়। একশো দিনের এই খতিয়ান কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, আগামী দিনগুলোতে কাজের এই গতি ধরে রাখাই এখন নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

