আকাশের মুখ ভার ছিল সকাল থেকেই। দুপুরের দিকে নামল মুষলধারে বৃষ্টি। মাত্র এক ঘণ্টার প্রবল বর্ষণেই জলমগ্ন হয়ে পড়ল রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ শনির আখড়া পশুর হাট। ঈদুল আজহা সামনে রেখে হাটে আসা হাজার হাজার কোরবানির পশু এখন দাঁড়িয়ে আছে কাদা আর নোংরা পানির ভেতরে। কোথাও কোথাও পানি জমে ছোটখাটো ডোবায় পরিণত হয়েছে। ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে আবহাওয়ার এমন বৈরী আচরণে চরম বিপাকে পড়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় ক্রেতারা।
সোমবার (২৫ মে) বিকেলে শনির আখড়া পশুর হাট ঘুরে দেখা যায় এক বিপর্যস্ত চিত্র। হাটের মূল চত্বর থেকে শুরু করে ভেতরের প্রতিটি গলি এখন কর্দমাক্ত। বৃষ্টির পানি আর গোবরের মিশ্রণে পুরো এলাকায় এক দমবন্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর মাঝেই বিক্রেতারা কোদাল হাতে নিজেদের জায়গা থেকে পানি সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। কেউ কেউ পশুর পায়ের নিচে খড় কিংবা বালু বিছিয়ে দিচ্ছেন, যাতে পশুগুলো একটু শুকনো জায়গায় দাঁড়াতে পারে। তবে ক্রমাগত বৃষ্টির কারণে সেই চেষ্টাও খুব একটা কাজে আসছে না।
কয়েক দিনের ভ্যাপসা গরমের পর রোববার বিকেলের বৃষ্টি নগরবাসীকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল। তবে সোমবারের দুপুরের বৃষ্টি স্বস্তির চেয়ে অস্বস্তিই বাড়িয়েছে বেশি। আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এদিন দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে কেবল রাজধানীতেই ৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মে মাসের এই শেষভাগে এসে এমন আকস্মিক ও ভারী বর্ষণ ঢাকার নিচু এলাকাগুলোর ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে আবার স্পষ্ট করে তুলেছে। পশুর হাটের মতো সাময়িক ও জনাকীর্ণ স্থানে এই জলজট যেন এক বড় ধরনের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পানির ভেতরেই দাঁড়িয়ে অবুজ পশু
শনির আখড়া হাটের বাঁশের খুঁটিগুলোতে বাঁধা গরুগুলোর অবস্থা সবচেয়ে করুণ। অনেক গরুকে দেখা গেছে হাঁটু সমান পানির মধ্যে অলস দাঁড়িয়ে থাকতে। দীর্ঘ সময় কাদা ও পানিতে দাঁড়িয়ে থাকায় পশুগুলোর শরীর কাঁপছে। অনেক ব্যবসায়ী তাদের আদরের পশুকে পলিথিন বা চট দিয়ে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কোথাও আবার ক্লান্ত পশুগুলোকে কাদার মাঝেই শুয়ে পড়তে দেখা গেছে। এতে করে পশুর চামড়ায় রোগবালাই ছড়ানোর আশঙ্কা করছেন খামারিরা।
জামালপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এই হাটে এসেছেন প্রবীণ গরু ব্যবসায়ী হাসেম আলী। নিজের খামারের ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ১৫টি বড় আকারের গরু নিয়ে চার দিন আগে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। হাটের এক কোণে ভেজা কাপড়ে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন। হাসেম জানান, হাটে আসার পর প্রথম দুই দিন আবহাওয়া ভালো থাকায় সাতটি গরু বেশ ভালো দামে বিক্রি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু সোমবারের এই বৃষ্টি তার বাকি ব্যবসার হিসাব ওলটপালট করে দিয়েছে।
ব্যবসায়ী হাসেম বলেন, “বৃষ্টির কারণে হাটের অবস্থা একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। আটটি গরু এখনো অবিক্রীত রয়ে গেছে। এই অবুজ জানোয়ারগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখতে হচ্ছে। ওদের কষ্ট দেখে নিজেরও খারাপ লাগছে। কিন্তু আমাদের তো কিছু করার নেই। কাদা আর পানির কারণে ক্রেতারা এই দিকে আসতেই চাচ্ছেন না। হাটের ভেতরের ড্রেনগুলো পরিষ্কার না থাকায় পানি নামছে না।”
বাজার এখনো জমেনি, চিন্তায় খামারিরা
একই ধরণের হতাশা প্রকাশ করলেন ফরিদপুর থেকে আসা আরেক ব্যবসায়ী সিদ্দিক মৃধা। তিনি ও তার ছোট ভাই মিলে নিজেদের পারিবারিক খামারে লালন-পালন করা ১২টি মাঝারি ও বড় জাতের ষাঁড় নিয়ে শনির আখড়ায় আস্তানা গেড়েছেন। হাটে আসার আজ দুই দিন পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তারা একটি গরুরও মুখ দেখতে পারেননি, অর্থাৎ কোনো বিক্রি বা ভালো কাস্টমার পাননি।
সিদ্দিক মৃধা বলেন, “কোরবানির বাজার এখনো পুরোপুরি জমেনি। মানুষ সাধারণত ঈদের দু-তিন দিন আগে থেকে পুরোদমে কেনাকাটা শুরু করে। আমরা আশা করেছিলাম আজ বিকেল থেকে কাস্টমার বাড়বে। কিন্তু এই অসময়ের বৃষ্টি সব ভেস্তে দিল। বৃষ্টির কারণে হাটে মানুষের আনাগোনা অনেক কমে গেছে। যারাও আসছেন, তারা কেবল দাম দেখছেন, কাদার ভয়ে ভেতরে ঢুকছেন না।” তবে শেষ সময়ে আবহাওয়ার উন্নতি হলে সব গরু বিক্রি হবে বলে আশা ছাড়ছেন না তিনি।
পশুর হাটের ভেতরের এই দূরবস্থার কারণে কেবল বিক্রেতারাই নন, সাধারণ ক্রেতারাও পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। নোংরা পানি আর পিছল কাদার কারণে হাটের ভেতরে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে চলা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক ক্রেতাকে দেখা গেছে বুট জুতো পরে কিংবা প্যান্ট গুটিয়ে হাটে প্রবেশ করতে। নারী ও বয়োবৃদ্ধ ক্রেতারা হাটের এই কাদা এড়াতে দূর থেকেই গরুর দরদাম করার চেষ্টা করছেন। এতে করে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যকার স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে।
কাদা মাড়িয়েই চলছে পছন্দের গরুর খোঁজ
শনির আখড়া হাটে কুরবানির পশু কিনতে আসা যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা আবদুল হামিদ নিজের ক্ষোভ লুকাতে পারলেন না। তিনি বলেন, “প্রতি বছরই হাটের এই এক দশা হয়। একটু বৃষ্টি হলেই পুরো মাঠ কাদার সমুদ্র হয়ে যায়। ঠিকমতো পা ফেলার জায়গা নেই। পা পিছলে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। এই কাদার মধ্যে গরুর কাছে গিয়ে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা বা দাঁত দেখা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। হাট ইজারাদারদের উচিত ছিল আগে থেকেই পর্যাপ্ত বালু বা ইটের খোয়া দিয়ে মাঠ প্রস্তুত রাখা।”
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাটের ভেতরের কিছু জায়গায় বিক্রেতারা নিজেদের গাঁটের পয়সা খরচ করে স্থানীয় শ্রমিকদের দিয়ে বালু ফেলাচ্ছেন। প্রতি বস্তা বালুর জন্য তাদের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে। খড় বা কাঠের গুঁড়ো দিয়ে পশুর থাকার জায়গাটি সাময়িকভাবে শুকানো হলেও বৃষ্টির তোড়ে তা বারবার ভিজে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, যদি এই বৃষ্টি আরও দু-এক দিন স্থায়ী হয়, তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থেকে আসা বিক্রেতারা, যাদের থাকার সুনির্দিষ্ট জায়গা নেই, তারা রাতে চরম বিপাকে পড়বেন।
পশুর হাটের এই অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদেরও। হাটের নোংরা পানি উপচে আশপাশের সড়ক ও গলিতে চলে আসায় সাধারণ পথচারীদের যাতায়াতও কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে হাট পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আকস্মিক ও অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে এই সাময়িক জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য পাম্প বসানোর কাজ চলছে এবং কাদা কমাতে নতুন করে বালু ছিটানো হচ্ছে।
নিয়তির ওপর ভরসা করে অপেক্ষা
নদী ও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মে মাসের এই সময়ে কালবৈশাখী বা বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে ঢাকার নগর পরিকল্পনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক না হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই পশুর হাটগুলোর এই দশা হয়। কোরবানির বর্জ্য এবং হাটের এই নোংরা পানি যদি দ্রুত পরিষ্কার করা না হয়, তবে ঈদের পর ওই এলাকায় ডেঙ্গু বা অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।
বিকেলের আলো যখন ম্লান হয়ে আসছিল, তখনো শনির আখড়া হাটে বৃষ্টির রেশ পুরোপুরি কাটেনি। কাদা মাখানো চামড়া নিয়ে গরুগুলো দাঁড়িয়ে রইল আর তাদের পাশে ছাতা মাথায় দিয়ে বিক্রেতারা অপেক্ষায় রইলেন নতুন কোনো ক্রেতার। এই কাদা, পানি আর দুর্গন্ধের ভেতরেই লুকিয়ে আছে লাখো খামারির সারা বছরের হাড়ভাঙা খাটুনির স্বপ্ন। আবহাওয়ার মেঘ কেটে গিয়ে কালকের সূর্য যেন তাদের মুখে হাসি ফোটায়, এই প্রার্থনাই এখন চারপাশের থমথমে বাতাসে ভাসছে।

