আকাশজুড়ে সকাল থেকেই মেঘের ঘনঘটা। মে মাসের চেনা গুমোট গরমের পর দুপুরের দিকে শুরু হয় ঝুম বৃষ্টি। আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস বলছিল ঝড়-বৃষ্টির কথা, আর তার বাস্তব প্রভাব দেখা গেল ঢাকার প্রধান নদীবন্দর সদরঘাটে। পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে সরকারি ছুটি শুরু হলেও চিরচেনা সদরঘাটে এখনো সেই চেনা উপচে পড়া ভিড় উধাও।
সোমবার (২৫ মে) সকাল থেকে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে এক ভিন্ন চিত্র। প্রতিবার ঈদের আগে যেখানে পা ফেলার জায়গা থাকে না, এবার সেখানে পল্টুনগুলো অনেকটাই ফাঁকা। ঘরমুখো মানুষের উপস্থিতি অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশ কম। তবে লঞ্চ মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, বেলার শেষে বৃষ্টি কমলে সন্ধ্যার পর থেকে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
টার্মিনালে যাত্রীদের চিরকালের সেই হুড়োহুড়ি বা ঠেলাঠেলি নেই। এর বদলে ঘাটে ঘাটে নোঙর করে থাকা লঞ্চগুলোতে যাত্রীরা বেশ শান্তভাবেই উঠছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিভিন্ন পয়েন্টে সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে। যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
সরাসরি যাত্রার টানে নৌপথের নির্ভরতা
ঈদের ছুটিতে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে ভোলার চরফ্যাশনে যাচ্ছেন মাহমুদ। তিনি পেশায় একটি বেসরকারি হাসপাতালের কর্মী। বাসের চেয়ে নৌপথকেই তিনি সবসময় বেশি নিরাপদ ও সুবিধাজনক মনে করেন।
মাহমুদ বলেন, “বাসে গেলে ঝক্কি অনেক বেশি। প্রথমে বরিশাল যেতে হয়, সেখান থেকে আবার লোকাল বাসে বা নৌকায় করে ভোলায় পৌঁছাতে হয়। কিন্তু লঞ্চে সেই ঝামেলা নেই। একবার কেবিনে বা ডেকে উঠলে সরাসরি গন্তব্যে যাওয়া যায়।” সদরঘাটের বর্তমান চিত্র নিয়ে তিনি বেশ সন্তুষ্ট। কোনো বাড়তি ভাড়া দিতে হয়নি এবং ভিড় না থাকায় স্বস্তিতেই বাড়ি ফিরতে পারবেন বলে আশা তার।
বরিশালগামী আরেক যাত্রী আসিফের গলাতেও একই সুর। তিনি সপরিবারে ঢাকা ছাড়ছেন। আসিফ জানান, “পরিবার নিয়ে ভ্রমণের জন্য লঞ্চের চেয়ে আরামদায়ক আর কিছু হতে পারে না। বাসের মতো এখানে ঝাঁকুনি নেই, আবার বাচ্ছাদের নিয়েও হাঁটাচলা করা যায়।”
বৃষ্টির কারণে রাস্তার ভোগান্তি
নৌপথের যাত্রা আরামদায়ক হলেও সদরঘাটে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর ছিল না বলে জানান যাত্রীরা। আসিফ বলেন, গুলিস্তান থেকে রায় সাহেব বাজার পর্যন্ত বাসে আসতে পারলেও পুরান ঢাকার ভেতরের রাস্তাগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ।
বৃষ্টির কারণে রায় সাহেব বাজারের পর থেকে রাস্তাগুলো কাদা আর পানিতে একাকার হয়ে গেছে। ফলে বিকল্প যান হিসেবে রিকশা বা ঘোড়ার গাড়িই ছিল একমাত্র ভরসা। অনেককে আবার মাথায় ভারী ট্রাঙ্ক বা ব্যাগ নিয়ে পায়ে হেঁটেই সদরঘাট পর্যন্ত আসতে হয়েছে। এই বৃষ্টির ভোগান্তিটুকু বাদ দিলে এবারের ঈদযাত্রা অন্যবারের চেয়ে অনেক ভালো বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ।
ভোলার বোরহানউদ্দিন রুটের ‘গাজী সালাউদ্দিন’ লঞ্চের সুপারভাইজার লিটন বলেন, “আজকে সরকারি অফিস-আদালত বন্ধ হওয়ার কারণে সকালের দিকে যাত্রী একটু বেড়েছিল। কিন্তু এই অসময়ের বৃষ্টির কারণে মানুষ ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছে। ফলে অন্যান্য বছরের এই দিনের তুলনায় এবার ডেকে অনেক জায়গা খালি।”
ভাড়া নিয়ে নেই তেমন অভিযোগ
লঞ্চের কর্মচারীরা আশা করছেন, আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে যাত্রীর ঢল নামবে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে সড়কপথের চেয়ে নৌপথ এখনো জনপ্রিয়। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, যাতায়াত খরচ বাসের চেয়ে অনেক কম এবং সময়মতো পৌঁছানো যায়।
লঞ্চের ভাড়া নিয়ে জানতে চাইলে সুপারভাইজার লিটন দাবি করেন, “সরকার নির্ধারিত যে চার্ট দেওয়া আছে, আমরা সেই অনুযায়ীই ভাড়া নিচ্ছি। এখন যাত্রীই নেই, তার ওপর অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের তো কোনো সুযোগই আসে না।” টার্মিনালে থাকা কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে কথা বলেও ভাড়া নিয়ে বিশেষ কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি।
সদরঘাটে দায়িত্বরত বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. জহিরুল ইসলাম জানান, আবহাওয়া যেমনই হোক, ঈদের শিডিউল অনুযায়ী লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। সোমবার সারাদিনে ৮০টিরও বেশি লঞ্চ সদরঘাট টার্মিনাল ছেড়ে যাবে।
৩৩টি রুটে চলছে বিশেষ নজরদারি
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, চাঁদপুর, শরীয়তপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের ৩৩টি নৌরুটে এসব লঞ্চ চলাচল করছে। দুপুরের পর পর্যন্ত পল্টুনে যাত্রীদের কোনো বাড়তি চাপ তৈরি হয়নি। তবে সন্ধ্যার পর গার্মেন্টস ও বিভিন্ন বেসরকারি কারখানা ছুটি হলে নদীপারের মানুষের ভিড় এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে যেতে পারে।
এদিকে নৌপথে যাত্রীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টার্মিনাল এলাকায় নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের বিশেষ টিম টহল দিচ্ছে। কোনো লঞ্চ যেন অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে ঘাট ছেড়ে যেতে না পারে, সেজন্য সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি করা হচ্ছে। নদীর মাঝখানেও কোস্টগার্ডের স্পিডবোটগুলো টহল দিচ্ছে।
লঞ্চ মালিকদের সংগঠনগুলোর মতে, মূল সংকট আসলে আবহাওয়া। বৈরী আবহাওয়া কেটে গিয়ে যদি আকাশ পরিষ্কার হয়, তবে ঈদের আগের শেষ দুই দিনে সদরঘাটের চিত্র পুরোপুরি বদলে যাবে। তখন যাত্রীর চাপ সামলাতে বিশেষ লঞ্চের সংখ্যা আরও বাড়াতে হতে পারে। তবে আপাতত মেঘলা আকাশ আর বৃষ্টির চাদরে ঢাকা সদরঘাটে এক শান্ত ও ধীরগতির ঈদযাত্রা দেখছে ঢাকাবাসী।

