রাজধানীর গুলিস্তানের সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটের সামনের ফুটপাত। চিরচেনা সেই চাদর বিছানো টেবিলগুলো থরে থরে সাজানো। চকচকে লাল, সবুজ আর বেগুনি রঙের নতুন নোটের বান্ডিলগুলো রোদে চিকচিক করছে। বিক্রেতাদের চোখে-মুখে প্রত্যাশার চাপ, কিন্তু কপালে চিন্তার ভাঁজ।
ইসলামী পঞ্জিকা অনুযায়ী কোরবানির ঈদ বা ঈদুল আজহা দরজায় কড়া নাড়ছে। সাধারণত এই সময়ে নতুন নোটের বাজারে পা ফেলার জায়গা থাকে না। অথচ মে মাসের এই তপ্ত দুপুরে বিক্রেতারা বসে আছেন অলস সময় নিয়ে। বাজারে বিক্রেতা আছেন প্রচুর, কিন্তু সেই তুলনায় ক্রেতার দেখা নেই।
মাঝে মধ্যে দুই-একজন পথচারী কৌতুহল নিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। নোটের বান্ডিল নেড়েচেড়ে দেখছেন। কিন্তু বিক্রেতা দাম হাঁকাতেই ক্রেতার ভ্রু কুচকে যাচ্ছে। কোনো দরদাম না করেই তারা নীরবে ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। অতিরিক্ত মূল্যের কারণেই মূলত আগ্রহ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
চড়া মূল্যের ফাঁদে নতুন নোট
সোমবার (২৫ মে) গুলিস্তানের এই ঐতিহ্যবাহী টাকার বাজার ঘুরে দেখা গেল এক অদ্ভুত নীরবতা। গুলিস্তান সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটের সামনে সারি সারি বসেছে নতুন টাকা বিক্রির অস্থায়ী দোকান। একজন ক্রেতা ওই পথ দিয়ে গেলেই একসঙ্গে হেঁকে উঠছেন চার-পাঁচজন বিক্রেতা।
ক্রেতাদের মূল ক্ষোভ দোকানিদের অতিরিক্ত মুনাফা করার প্রবণতা নিয়ে। বাজারে টাকার সরবরাহ যেমনই হোক, বিক্রেতারা প্রতি বান্ডিলে যে পরিমাণ বাড়তি টাকা দাবি করছেন, তাকে অনেকেই ‘অন্যায্য’ বলে অভিহিত করছেন। ফলে উৎসবের আবহেও এই বাজারটি এবার অনেকটাই মলিন।
বাজারের বর্তমান দরদাম বিশ্লেষণ করলে ক্রেতাদের এই ক্ষোভের কারণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাঁচ টাকার একটি বান্ডিলে মোট পাঁচশত টাকা থাকে। ক্রেতাদের অভিযোগ, এই এক বান্ডিল পাঁচ টাকার নোট নিতে তাদের অতিরিক্ত ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।
নোটভেদে বাড়তি টাকার খতিয়ান
সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে ছোট নোটগুলোর। বিশেষ করে ১০ ও ২০ টাকার নোটের। কিন্তু এবার এই নোটগুলোর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ১০ টাকার প্রতিটি এক হাজার টাকার বান্ডিল এখন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ টাকা দরে। অর্থাৎ, ক্রেতাকে বাড়তি দিতে হচ্ছে ৪০০ টাকা।
একই চিত্র ২০ টাকার নোটের বান্ডিলগুলোতেও। এক বান্ডিলে মোট ২ হাজার টাকা থাকলেও ক্রেতাকে সেটি কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ টাকায়। এখানেও অতিরিক্ত ৪০০ টাকা গুনতে হচ্ছে। উৎসবের বকশিশের জন্য যারা এই নোটগুলো খোঁজেন, তারা এবার বেশ বিপাকে পড়েছেন।
বড় নোটগুলোর ক্ষেত্রেও বাড়তি টাকার অঙ্কটা কম নয়। ৫০ টাকার বান্ডিলে আসল টাকার পরিমাণ ৫ হাজার। কিন্তু গুলিস্তানের বাজারে এটি কিনতে ক্রেতাদের পকেট থেকে খসছে ৫ হাজার ৩০০ টাকা। আবার ১০০ টাকার এক হাজার নোটের বান্ডিল নিতেও অতিরিক্ত ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দাবি করছেন বিক্রেতারা।
বিক্রেতাদের কণ্ঠে হতাশার সুর
দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রজব আলী। চাদরের ওপর টাকার বান্ডিলগুলো গুছিয়ে রাখতে রাখতে তিনি নিজের হতাশার কথা জানালেন। অন্য যেকোনো ঈদের সময়ে এই দিনে তার দম ফেলার ফুসরত থাকত না। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন, যা তাকে বেশ চিন্তায় ফেলেছে।
রজব আলী বলেন, “অন্য সময় এই দিনে আমাদের হাত খালি থাকত না। ভালো বিক্রি হতো। কিন্তু এবার ঈদে বাজারে কোনো ক্রেতাই নেই। দুই-একজন মানুষ এলেও দাম শুনেই চলে যাচ্ছে। বেচা-বিক্রি একদম নাই বললেই চলে।” সামনের দিনগুলোয় বিক্রির আর কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না তিনি।
আরেক প্রবীণ বিক্রেতা লোকমান হোসেনের কণ্ঠেও ফুটে উঠল একই সুর। তিনি মূলত পাইকারি বাজার থেকে এই টাকাগুলো কিনে এনে খুচরা বিক্রি করেন। তার মতে, সাধারণ মানুষ কেবল বাড়তি দামের কথাই ভাবছে, কিন্তু বিক্রেতাদের নিজস্ব খরচের দিকটা কেউ দেখছে না।
জীবিকার তাগিদে চড়া দামের পক্ষে যুক্তি
লোকমান হোসেন তার ব্যবসার পেছনের বাস্তবতার কথা তুলে ধরে বলেন, “সবাই আসে, দাম জিজ্ঞেস করে আর চলে যায়। বিক্রি তেমন একটা হচ্ছে না। আমাদেরও তো এই টাকাগুলো বেশি দামে কিনে আনতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বাইরে থেকে যখন আমরা সংগ্রহ করি, তখন আমাদেরও বাড়তি টাকা দিতে হয়।”
তিনি আরও যোগ করেন, “বেশি দামে কিনতে হয় দেখেই আমাদের একটু বেশি দামে বেচতে হয়। এখানে আমাদের হাত বাঁধা, কিছুই করার নেই। এই ব্যবসাই আমাদের একমাত্র অবলম্বন। এই করেই তো আমাদের সংসার চালাতে হয়, বউ-বাচ্চার মুখে খাবার তুলে দিতে হয়।”
গুলিস্তানের এই নতুন টাকার বাজারটি মূলত অনানুষ্ঠানিক। বছরের পর বছর ধরে এখানে উৎসবকে কেন্দ্র করে এক ধরনের মৌসুমি অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। তবে এবারের মন্দা এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। অনেকেরই পুঁজি আটকে গেছে এই চকচকে নোটের বান্ডিলে।
ক্ষুব্ধ ক্রেতাদের ‘গলা কাটা’ দামের অভিযোগ
ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার আগে বাচ্চাদের জন্য নতুন নোট কিনতে এসেছিলেন বেসরকারি চাকুরিজীবী জুবায়ের আহমেদ। গ্রামীণ পরিবারে ঈদে ছোটদের নতুন টাকা দেওয়ার আনন্দই আলাদা। কিন্তু বাজারের দাম দেখে তিনি টাকা না কিনেই ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জুবায়ের আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বাড়িতে বাচ্চাদের দেওয়ার জন্য নতুন নোট কিনতে এসেছিলাম। কিন্তু এখানে এসে দেখি দামের কোনো ঠিকঠিকানা নেই। ১ হাজার টাকা নিতে গেলে যদি অতিরিক্ত চারশত থেকে পাঁচশত টাকা দিতে হয়, তবে সেটা কীভাবে মানা যায়? এটা পুরোপুরি অন্যায্য।”
একই ধরনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন আরেক ক্রেতা সুমন। তিনি জানান, নতুন নোটের যে চড়া দাম হাঁকা হচ্ছে, তা মধ্যবিত্তের জন্য এক ধরনের উৎসবের অতিরিক্ত বোঝা। “নতুন নোট কিনতে এসেছিলাম শখ করে। কিন্তু যে দাম, তাতে এবার আর কেনা হবে না। এরা রীতিমতো গলা কাটার মতো টাকা নিচ্ছে,” বলেন সুমন।
কেন এই বাড়তি মূল্যের সংকট?
সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঈদের আগে জনসাধারণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় নতুন নোট বাজারে ছাড়ে। কিন্তু সেই লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা তোলার ঝক্কি অনেক। সেই সুযোগটাই নেন গুলিস্তানের এই ব্যবসায়ীরা। তারা বিভিন্ন উৎস থেকে আগেভাগেই নতুন টাকা সংগ্রহ করে এখানে মজুত করেন।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এবার ব্যাংক থেকে নতুন নোট পাওয়ার প্রক্রিয়াটি আগের চেয়ে কিছুটা জটিল ছিল। ফলে পাইকারি বাজারেও নতুন নোটের সংকট তৈরি হয়েছে। আর এই সংকটের অজুহাতে খুচরা বিক্রেতারাও দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন, যা সাধারণ ক্রেতাদের বাজারবিমুখ করে তুলেছে।
অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের এই সময়ে মানুষ উৎসবের কেনাকাটাতেই কাটছাঁট করছে। সেখানে নতুন নোটের জন্য অতিরিক্ত ৩০০ বা ৪০০ টাকা খরচ করাকে অনেকেই অপচয় বলে মনে করছেন। ফলে সরবরাহ থাকলেও ক্রেতার অভাবে গুলিস্তানের এই বাজার এখন স্থবির হয়ে পড়েছে।
উৎসবের আনন্দ বনাম বাজারের বাস্তবতা
বাঙালি সংস্কৃতিতে ঈদে ছোটদের নতুন টাকা দেওয়া এক দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। ঈদের দিন সকালে নতুন জামা পরে বড়দের সালাম করে নতুন চকচকে নোট পাওয়ার আনন্দ শিশুদের জন্য অমূল্য। এই আনন্দটুকুর টানেই প্রতিবছর মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ গুলিস্তানের ফুটপাতে ছুটে আসেন।
তবে ২০২৬ সালের এই অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সেই আনন্দের ওপর কিছুটা হলেও কালো মেঘের ছায়া পড়েছে। একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতি, অন্যদিকে নতুন নোটের এই লাগামহীন দাম। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের উৎসবের বাজেট এখন বেশ সংকুচিত।
বিকেলের দিকে আকাশে মেঘের আনাগোনা বাড়লে বিক্রেতারা পলিথিন দিয়ে তাদের টাকার বান্ডিলগুলো ঢাকতে শুরু করেন। সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটের সামনের ফুটপাতটি আবার ব্যস্ত হয়ে ওঠে সাধারণ পথচারীদের যাতায়াতে। তবে টাকার দোকানগুলোর সামনে সেই প্রত্যাশিত ভিড় আর জমে ওঠে না।

