রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে সাড়া জাগানো শিশু রামিসা ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এক বড় অগ্রগতি হয়েছে। ঘটনার মাত্র চার দিনের মাথায় মামলার ডিএনএ প্রোফাইলিং, ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা রিপোর্ট হাতে পেয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।
শনিবার (২৩ মে) পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ইউনিট থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান গণমাধ্যমকে এই রিপোর্ট হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া নিপুন দুপুরের দিকে সিআইডি কার্যালয় থেকে এই ফরেনসিক নথিপত্র গ্রহণ করেন। এই তিন রিপোর্টের প্রাপ্তি মামলার বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছে পুলিশ।
শেষ পর্যায়ে তদন্ত, আজই চার্জশিট জমার সম্ভাবনা
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ফরেনসিক ও মেডিকেল রিপোর্টের জন্য সাধারণত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। তবে এই শিশু হত্যার ভয়াবহতা বিবেচনা করে সিআইডির ল্যাব অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ডিএনএ ও ভিসেরা পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে।
মেডিকেল ও ফরেনসিক প্রমাণের এই শক্তিশালী ভিত্তি পাওয়ার পর মামলার তদন্ত কার্যক্রম এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পুলিশ আর সময় নষ্ট করতে চাইছে না। রিপোর্টগুলো হাতে আসার পরপরই পল্লবী থানা পুলিশ আদালতে জমা দেওয়ার জন্য মামলার চূড়ান্ত অভিযোগপত্র বা চার্জশিট তৈরির কাজ শুরু করেছে।
থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নথিপত্র গোছানোর কাজ যদি রাতের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হয়, তবে আজ রবিবার (২৪ মে) বিকেলের মধ্যেই আদালতে এই মামলার চার্জশিট দাখিল করা হবে। অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে কোনো ফাঁকফোকর রাখতে চাইছে না রাষ্ট্রপক্ষ।
খাটের নিচে মস্তকবিহীন দেহ, বাথরুমে খণ্ডিত মাথা
এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সূচনা হয়েছিল গত ১৯ মে সকালে। পল্লবীর একটি আবাসিক ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে ভেসে আসা রহস্যজনক গন্ধ আর প্রতিবেশীদের সন্দেহের সূত্র ধরে পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়।
ফ্ল্যাটের একটি ঘরের ভেতরের খাটের নিচ থেকে প্রথমে রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করে পল্লবী থানা পুলিশ। তল্লাশির এক পর্যায়ে পাশের বাথরুমের একটি বালতি থেকে তার খণ্ডিত মাথাটি উদ্ধার করা হয়।
এই বীভৎস দৃশ্য দেখে খোদ পুলিশ কর্মকর্তারাও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত আবাসিক এলাকায় একটি অবুজ শিশুর সাথে এমন পৈশাচিক আচরণ পুরো দেশের মানুষকে নাড়া দিয়েছিল। ঘটনার দিনই নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
প্রধান আসামির স্বীকারোক্তি ও গ্রেফতারের বিবরণ
নৃশংস এই ঘটনার পর পুলিশ কালক্ষেপণ না করে মাঠে নামে। ঘটনার পরপরই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ প্রথমে প্রধান আসামি সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আটক করে।
তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর একটি গোপন আস্তানা থেকে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। গ্রেফতারের পর পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করে।
পরবর্তীতে আইনগত প্রক্রিয়া মেনে সোহেল রানাকে আদালতে হাজির করা হলে সে বিচারকের সামনে ফৌজিদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়। ইতমধ্যেই তাকে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ফরেনসিক রিপোর্টের আইনি গুরুত্ব ও বিচার প্রক্রিয়া
ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আসামির কেবল মুখের স্বীকারোক্তি আদালতের রায় ঘোষণার জন্য যথেষ্ট নয়। অনেক সময় আসামিরা পরবর্তীতে আদালতে নিজেদের বক্তব্য অস্বীকার করে।
এই ধরনের পরিস্থিতিতে ডিএনএ টেস্ট ও ময়নাতদন্তের মতো ফরেনসিক রিপোর্টগুলোই আদালতে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয়। রামিসার শরীরে আসামির ডিএনএর উপস্থিতি মিলেছে কি না, তা এই রিপোর্টের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হবে।
আজ রবিবার আদালতে অভিযোগপত্র জমা পড়ার পর মামলার নথিপত্র বিচারিক আদালতে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। রামিসার পরিবার ও দেশের সাধারণ মানুষ আশা করছেন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই নরপিশাচের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে, যেন ভবিষ্যতে আর কোনো শিশুর জীবন এভাবে প্রদীপ নিভে যাওয়ার মতো শেষ না হয়।

