বাংলাদেশে অবুজ শিশুদের ওপর সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া একের পর এক নির্মম ও নৃশংস সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। সমাজের বিভিন্ন স্তরে চেপে বসা এক ধরনের নীরবতাকে ভেঙে ফেলার ডাক দিয়ে সংস্থাটি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, শিশুদের ওপর যেকোনো ধরনের বর্বরতা এবার অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।
আজ শনিবার (২৩ মে) বিকেলে আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটির ঢাকা অফিস থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিশেষ বিবৃতিতে এই উদ্বেগের কথা জানানো হয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছেলে ও মেয়ে শিশুদের ধর্ষণ এবং হত্যার মতো লোমহর্ষক ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বিবৃতিতে ইউনিসেফ উল্লেখ করে, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের ওপর যে ধরনের ভয়ংকর ও পাশবিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, তাতে তারা গভীরভাবে মর্মাহত এবং স্তম্ভিত। একটি সুস্থ ও সভ্য সমাজে শিশুদের সাথে এই ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে মনে করে সংস্থাটি।
সবচেয়ে নিরাপদ স্থানেই শিশুরা অনিরাপদ
জাতিসংঘের এই সংস্থাটি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শিশুদের বসবাসের পরিবেশ নিয়ে। তাদের মতে, যেসব জায়গা একটি শিশুর জন্য সবচেয়ে বেশি নিরাপদ ও সুরক্ষামূলক হওয়ার কথা ছিল, আজ সেখানেই তারা সবচেয়ে বেশি সহিংসতার শিকার হচ্ছে। নিজ বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা খেলার মাঠেও শিশুরা আজ নিরাপদ নয়।
সহিংসতার শিকার হওয়া সেসব ভাগ্যহত শিশু এবং তাদের শোকার্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে ইউনিসেফ। একই সাথে সংস্থাটি মনে করিয়ে দিয়েছে, কেবল সমবেদনা জানিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায় থেকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া।
পরিসংখ্যানের দিকে আঙুল তুলে বিবৃতিতে বলা হয়, চলতি ২০২৬ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে নির্মম শারীরিক এবং যৌন সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এই প্রবণতা কেবল একটি সাময়িক অপরাধের চিত্র নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক শিশু সুরক্ষা কাঠামোর এক বড় ধরণের দুর্বলতাকে নির্দেশ করে।
ভেঙে ফেলতে হবে অপরাধীদের দায়মুক্তির দেয়াল
বিদ্যমান এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সারা দেশে শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ আরও জোরদার করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। ইউনিসেফ মনে করে, অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার যে চেনা সংস্কৃতি সমাজে গড়ে উঠেছে, তা এই অপরাধের গ্রাফকে আরও উস্কে দিচ্ছে।
সংস্থাটি সাফ জানিয়েছে, অপরাধীদের এই রাজনৈতিক বা সামাজিক দায়মুক্তির সংস্কৃতি এখনই পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। একজন শিশু নির্যাতনকারী বা ধর্ষক যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় এনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো অসম্ভব।
একই সঙ্গে দেশের বিদ্যমান প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, ভুক্তভোগীদের অভিযোগ গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে যে বড় ধরনের ঘাটতি বা ফাঁকফোকর রয়েছে, তা দ্রুত দূর করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই সংস্কার প্রক্রিয়াটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে না রেখে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় করা উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
শিশুবান্ধব বিচার ব্যবস্থা ও মানসিক সহায়তার তাগিদ
ইউনিসেফ মনে করে, দেশের প্রচলিত পুলিশিং ব্যবস্থা এবং বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও বেশি শিশুবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে। অনেক সময় থানায় অভিযোগ করতে গিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো নতুন করে হয়রানির শিকার হয়। এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে পুলিশকে সাধারণ মানুষের জন্য আরও বেশি নির্ভরযোগ্য ও মানবিক হতে হবে।
এর পাশাপাশি গ্রামীণ ও শহরের পাড়া-মহল্লায় কমিউনিটি সুরক্ষা বলয় তৈরি এবং সামাজিক সেবাগুলোর বিদ্যমান ঘাটতিগুলো দূর করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কেবল আইন দিয়ে অপরাধ দমন সম্ভব নয়, যদি না স্থানীয় সমাজ ও সাধারণ মানুষ নিজেরা সচেতন হয়ে এই ধরনের অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট করে।
সহিংসতার শিকার হওয়া নারী ও শিশুদের জন্য অবিলম্বে প্রয়োজনীয় মনোসামাজিক বা কাউন্সিলিং সহায়তা নিশ্চিত করার ওপরও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে জাতিসংঘ। চিকিৎসকদের মতে, একটি শিশু যখন এই ধরনের ভয়াবহ ট্রমার মধ্য দিয়ে যায়, তখন তার মানসিক ক্ষত সারাতে দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, যা আমাদের দেশে অত্যন্ত অপ্রতুল।
স্কুল ও মাদ্রাসায় জবাবদিহিতা নিশ্চিতের তাগিদ
শিশুদের প্রতিদিনের যাতায়াত ও বসবাসের জায়গাগুলোতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে ইউনিসেফ। দেশের সব স্কুল, মাদ্রাসা, কর্মক্ষেত্র, পাড়া-মহল্লা এবং শিশুযত্ন কেন্দ্র বা ডে-কেয়ারগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে। যাতে শিক্ষকেরা বা দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা নিজেরা কোনো অন্যায়ের সাথে যুক্ত হতে না পারেন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং বহিরাগতদের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শিশুদের সুরক্ষায় একটি স্বাধীন তদারকি কমিটি গঠনের পরামর্শ দিচ্ছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। ইউনিসেফ সতর্ক করে বলেছে, কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে যদি সমাজে দীর্ঘস্থায়ী নীরবতা বজায় থাকে, তবে সেই অন্ধকার গলিপথ ধরে সহিংসতা আরও বিস্তার লাভ করে।
এই কারণেই শিশু, নারী, পরিবার, কমিউনিটি এবং সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে যেকোনো ধরণের অন্যায়, সহিংসতা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যায় দেখে মুখ ফিরিয়ে রাখার যে সংস্কৃতি আমাদের নাগরিক জীবনের অংশ হয়ে গেছে, তা পরিবর্তনের এখনই উপযুক্ত সময়।
প্রয়োজনে ১০৯৮ হেল্পলাইনে যোগাযোগের পরামর্শ
যেকোনো জরুরি মুহূর্তে বা শিশু নির্যাতনের খবর পাওয়া মাত্রই সাধারণ মানুষকে জাতীয় শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ‘১০৯৮’ (টেন নাইন এইট) নম্বরে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছে ইউনিসেফ। সম্পূর্ণ টোল-ফ্রি এই সরকারি নম্বরে কল করে যেকোনো নাগরিক শিশু সুরক্ষার বিষয়ে তথ্য দিতে পারেন বা তাৎক্ষণিক আইনি ও সামাজিক সহায়তা চাইতে পারেন।
এই হেল্পলাইনের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার শিশুদের উদ্ধার, তাদের জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদান এবং আইনি লড়াইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়ে থাকে। তবে দেশের একটি বড় অংশের মানুষ, বিশেষ করে প্রান্তিক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে এই হেল্পলাইনের কার্যকারিতা ও নম্বরটি এখনো পুরোপুরি পৌঁছায়নি।
তাই সরকারি উদ্যোগে এই ১০৯৮ নম্বরের ব্যাপক প্রচার ও প্রচারণা চালানোর তাগিদ দিয়েছেন অধিকারকর্মীরা। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেয়ালে এবং গণমাধ্যমে এই নম্বরটি নিয়মিত প্রদর্শন করা হলে শিশুরা নিজেরাও বিপদের সময় সচেতন হতে পারবে এবং নিজেদের রক্ষা করার একটি সুযোগ পাবে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন নির্যাতন বন্ধের আহ্বান
বিবৃতির শেষের দিকে এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আধুনিক সংকটের কথা তুলে ধরেছে ইউনিসেফ। সংস্থাটি অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেছে, যেকোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়া নারী ও শিশুদের মানবিক মর্যাদা এবং তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান দেখানো প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।
আজকাল দেখা যায়, কোনো অপরাধ ঘটার পর ভুক্তভোগী শিশুর ছবি, অডিও, ভিডিও বা তাদের নাম-ঠিকাসহ ব্যক্তিগত তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটকে দেদারসে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ইউনিসেফ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই ধরনের সস্তা সাকসেস বা ভিউ পাওয়ার চেষ্টা মূলত ভুক্তভোগীর ওপর এক নতুন ধরনের মানসিক নির্যাতনের শামিল।
এ ধরনের অনভিপ্রেত কর্মকাণ্ড কেবল আইনের লঙ্ঘনই নয়, বরং তা ভুক্তভোগী শিশু এবং তাদের ভেঙে পড়া পরিবারের সামাজিক কষ্ট ও মানসিক যন্ত্রণাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে অনেক পরিবার লোকলজ্জার ভয়ে আইনের আশ্রয় নিতেও দ্বিধাবোধ করে, যা পরোক্ষভাবে মূল অপরাধীকেই সুবিধা পাইয়ে দেয়।
গণমাধ্যম ও সাইবার ব্যবহারকারীদের প্রতি জরুরি বার্তা
দেশের মূলধারার গণমাধ্যম এবং সাধারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদের প্রতি এক বিশেষ ও জরুরি আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ। সংস্থাটি বলেছে, ভুক্তভোগীদের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং তাদের আত্মসম্মান বজায় রাখতে এই ধরনের সংবেদনশীল ছবি বা ভিডিও শেয়ার করা থেকে সবাইকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।
এর পরিবর্তে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে এবং শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সাইবার স্পেসে অপরাধের বীভৎসতা ছড়ানোর চেয়ে অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা এবং শক্তিশালী জনমত গড়ে তোলার ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশের শিশু অধিকার আন্দোলনের সাথে যুক্ত প্রবীণ সমাজকর্মীরা মনে করছেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে সাময়িক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, অপরাধীরা হয়তো সেই সুযোগটি নেওয়ার চেষ্টা করছে। ইউনিসেফের এই আন্তর্জাতিক বার্তাটি সরকারের জন্য একটি সতর্কসংকেত। সরকার যদি এখনই মাঠ পর্যায়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং শিশু সুরক্ষা আইনগুলোর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে না পারে, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে। শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা কোনো করুণা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।

