হাসপাতালের করিডোরজুড়ে এখন শুধুই মায়েরা তাদের অবুজ সন্তানদের বুকে জড়িয়ে ধরে অপেক্ষা করছেন। বাতাসে ভাসছে কান্নার রোল আর গভীর এক অসহায়ত্ব। দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব এখন এক ভয়ংকর মানবিক সংকটের রূপ নিয়েছে। কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না শিশুদের এই মৃত্যুর মিছিল। ভাইরাসটির করাল গ্রাসে গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও এর তীব্র উপসর্গ নিয়ে আরও ১৩টি নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ গেছে।
সরকারি খাতার এই নতুন সংখ্যাটি যোগ হওয়ার পর দেশে হামে মোট মৃত্যুর সংখ্যা এক ধাক্কায় ৫০০-এর গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই মাসে এই রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর গ্রাফ যেভাবে ওপরের দিকে উঠছে, তা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে দিয়েছে। মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসকেরা বলছেন, এবারের ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতা ও তীব্রতা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।
শনিবার (২৩ মে) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো নিয়মিত প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সরকারি তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় যে ১৩ জন শিশু মারা গেছে, তাদের মধ্যে ১২ জনের মৃত্যুই হয়েছে হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে। আর বাকি একজন নিশ্চিতভাবে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। হাসপাতালগুলোতে এখন শয্যা মেলাই ভার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আক্রান্তের সংখ্যা দুই হাজার পার
কেবল মৃত্যুই নয়, প্রতিদিন নতুন করে আক্রান্ত হওয়া শিশুর সংখ্যাও জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে আরও ২ হাজার ১৩২ জন শিশু এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় বহু আক্রান্ত শিশু এখনো হাসপাতালের খাতায় নাম লেখাতে পারেনি।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে আজ ২৩ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ। এই অল্প সময়ের ব্যবধানে সারা দেশে হাম এবং এর বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১২ জনে। মৃত শিশুদের পরিবারের স্বজনেরা বলছেন, সামান্য জ্বর ও সর্দি দিয়ে শুরু হওয়া এই রোগটি এত দ্রুত প্রাণ কেড়ে নেবে, তা তারা ভাবতেও পারেননি।
অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান আরও বিশদভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই ৫১২ জন মৃত শিশুর মধ্যে ৮৬ জনের শরীরে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি বা ‘মিজলস পজিটিভ’ পাওয়া গিয়েছিল। অন্যদিকে বাকি ৪২৬ জন শিশু মারা গেছে হামের স্পষ্ট ও তীব্র উপসর্গ নিয়ে, যাদের নমুনা পরীক্ষার আগেই বা পরীক্ষার রিপোর্ট আসার আগেই মৃত্যু হয়।
ঢাকার পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক
সারাদেশে এই রোগটি ছড়িয়ে পড়লেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর দিক থেকে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে ঢাকা বিভাগ। ঘনবসতিপূর্ণ এই মেগাসিটিতে ভাইরাসের বিস্তারের গতি সবচেয়ে বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, কেবল ঢাকা বিভাগেই এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ২১৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ, মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই ঘটেছে রাজধানী ও এর আশপাশের জেলাগুলোতে।
একইভাবে আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকেও ঢাকা বিভাগ তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে মোট ৩৫ হাজার ৫১৩ জন শিশু এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। ঢাকার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল এবং সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালগুলোতে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ধারণক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ রোগীকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে ৮ হাজার ৪৯৪ জন শিশু। এর বাইরে, পরীক্ষার বাইরে থাকা বা তীব্র উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে এসেছে আরও ৬২ হাজার ৫৬০ জন শিশু।
মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসকদের উদ্বেগ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজধানীর একটি সরকারি শিশু হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক জানান, এবারের সংকটের পেছনে মূল কারণ হলো টিকাদানের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের গ্যাপ বা শূন্যতা। অনেক শিশু যথাসময়ে হামের প্রতিষেধক বা এমআর (মিজলস-রুবেলা) টিকা পায়নি। এর ফলে তাদের শরীরে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো কোনো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠেনি।
তিনি আরও জানান, অনেক মা-বাবা শিশুর শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ ওঠার পর সেটিকে সাধারণ অ্যালার্জি ভেবে অবহেলা করছেন। যখন শিশুর তীব্র নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট কিংবা অনবরত ডায়রিয়া শুরু হচ্ছে, একদম শেষ মুহূর্তে তারা হাসপাতালে আসছেন। ততক্ষণে ভাইরাসের বিষক্রিয়া শিশুর ফুসফুস ও মস্তিস্কে ছড়িয়ে পড়ছে, যা চিকিৎসকদের পক্ষেও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে বায়ুবাহিত রোগ। আক্রান্ত শিশুর হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এটি দ্রুত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। মে মাসের এই তীব্র গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ভাইরাসের কার্যকারিতা আরও বেড়ে গেছে। এই চেইন বা সংক্রমণ চক্র ভাঙতে না পারলে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও বিপর্যয়কর হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
জরুরি পদক্ষেপের দাবি
এদিকে, পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই বিশেষ সেল গঠন করেছে। দেশের সব জেলা সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকাগুলোতে যেখানে টিকাদানের হার কম, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ বা বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করার তাগিদ এসেছে।
একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, বিশেষ করে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল এবং ওআরএস স্যালাইনের পর্যাপ্ত মজুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, হামে আক্রান্ত শিশুদের অন্ধত্ব ও অন্যান্য জটিলতা রোধে ভিটামিন-এ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে অনেক সময় এর সরবরাহ ঘাটতি দেখা যায়।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সরকারের এই স্বাস্থ্য বুলেটিনের চেয়েও মাঠ পর্যায়ে কার্যকর চিকিৎসার ওপর বেশি জোর দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব এবং পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় তাদের বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে, যা দরিদ্র মানুষের পক্ষে অসম্ভব। এই মহামারি ঠেকাতে সামাজিকভাবে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি সচল করা এখন সময়ের দাবি।

