দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি সমন্বিত পরিচয় ও সেবা নিশ্চিত করতে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড’ উদ্যোগ চালু করছে সরকার। এর মাধ্যমে সব ধরনের নাগরিক সেবা একীভূত ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হবে। একই সঙ্গে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোকে গুটি কয়েক গোষ্ঠীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পৃষ্ঠপোষকতার চেনা সংস্কৃতি ভেঙে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র এবং মানবিক অর্থনীতি গড়ে তোলাই এখন মূল লক্ষ্য।
আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এই বিশেষ আলোচনার আয়োজন করে একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা। যেখানে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নীতি-নির্ধারকেরা অংশ নেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘ সময় ধরে নির্দিষ্ট কিছু স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের কবজায় রেখেছিল। সেই অচলাবস্থা ভেঙে অর্থনীতিকে গণতান্ত্রিকীকরণ করা এখন আর কেবল কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ও অবিচ্ছেদ্য দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তৃণমূলের মানুষকে বাদ দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও সৃজনশীল অর্থনীতির অন্তর্ভুক্তি
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার বক্তব্যে গ্রামীণ জনপদের উৎপাদনশীল শক্তির ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে দেশের মূল অর্থনীতির গতিধারার বাইরে ছিটকে পড়া গ্রামীণ কামার, কুমার, তাঁতি ও জেলেসহ সব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নতুন বাজেটে তাদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা থাকবে।
পাশাপাশি দেশের তরুণ প্রজন্মের মেধাকে কাজে লাগিয়ে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে সরকার বড় বিনিয়োগে যাচ্ছে। থিয়েটার, লোকসংস্কৃতি, দেশীয় সংগীত, চিত্রকলা ও আর্টিফিশিয়াল জুয়েলারি খাতের মতো অপ্রচলিত কিন্তু অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই খাতগুলোর বাণিজ্যিক রূপান্তর এখন সময়ের দাবি।
অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, এসব সৃজনশীল খাতের আর্থিক মনিটাইজেশন ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রসারের লক্ষ্যে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বিশেষ প্রকল্প ও বড় অংকের তহবিল বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এছাড়া দেশের বড় বড় বিভাগীয় শহরগুলোতে সংস্কৃতিচর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সুনির্দিষ্ট ‘থিয়েটার ডিস্ট্রিক্ট’ গড়ে তোলা হবে, যা পর্যটন খাতকেও চাঙ্গা করবে।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ডিজিটাল অটোমেশন
ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল দেশে ব্যবসা পরিচালনার চড়া ব্যয় বা কস্ট অব ডুইং বিজনেস। অর্থমন্ত্রী এই সংকট স্বীকার করে বলেন, দেশের প্রধান বন্দরগুলোর কার্যক্রমে গতি আনা এবং পণ্য পরিবহনের বিভিন্ন ধাপে অবৈধ অতিরিক্ত চার্জ আদায় পুরোপুরি বন্ধ করতে সরকার কঠোরতম আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে। কোনো সিন্ডিকেটকে ছাড় দেওয়া হবে না।
ব্যবসায়িক লাইসেন্স ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করে আনা হচ্ছে। আমীর খসরু ঘোষণা দেন, আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের পুরো প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি বড় অংশকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল অটোমেশনের আওতায় আনা হবে। এই ডিজিটাল রূপান্তরেরই একটি বড় এবং প্রধান অংশ হলো ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড’ প্রকল্প।
প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অতীতে যে চরম ধীরগতি ও দুর্নীতি দেখা যেত, তা নিয়ন্ত্রণেও নতুন কঠোর নিয়ম চালু হচ্ছে। এখন থেকে সরকারের যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে তার বাস্তবায়ন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল মনিটরিং সেলের আওতায় আনা হবে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করার কড়া আইনি বাধ্যবাধকতা থাকবে।
শক্তিশালী পুঁজিবাজার ও ‘বাংলাদেশ বন্ড’
দেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর ঋণের অতিরিক্ত চাপ কমাতে বিকল্প অর্থায়নের ওপর জোর দিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থমন্ত্রী বলেন, উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণের ওপর শিল্পপতি ও উদ্যোক্তাদের যে চিরন্তন নির্ভরতা, তা কমিয়ে আনতে হবে। এর বিকল্প হিসেবে দেশের ক্যাপিটাল মার্কেট বা পুঁজিবাজার এবং বন্ড মার্কেটকে একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের এই নতুন অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনার ওপর আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা এবং বিদেশী পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের গভীর আগ্রহ ও আস্থা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের বড় আকারের কোম্পানিগুলো যাতে ব্যাংক ঋণের দিকে না ঝুঁকে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করে, সে জন্য নির্দিষ্ট টার্নওভারের পর তাদের শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে।
এর বাইরে প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে দেশে ও আন্তর্জাতিক বাজারে খুব শিগগিরই ‘বাংলাদেশ বন্ড’ চালুর আইনি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানান, এই বিশেষ বন্ডে বিনিয়োগের বিপরীতে সুদের হার ৬ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা বর্তমান বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতিতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও লাভজনক।
কর ব্যবস্থার খোলনলচে বদল
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বাড়াতে কর কাঠামোতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন আমীর খসরু। তিনি বলেন, এখন থেকে আর সাধারণ মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা চাপানো হবে না। বরং দেশে কার্যরত বহুজাতিক কোম্পানি এবং বড় বড় করদাতাদের প্রকৃত বার্ষিক আয় ও তাদের বাজার অংশীদারত্ব (মার্কেট শেয়ার) নিখুঁতভাবে যাচাই করে ন্যায্য কর আদায় করা হবে।
একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের করের আওতায় আনতে বিশেষ ছাড় দেওয়া হচ্ছে। শহরের ছোট ব্যবসায়ী ও সাধারণ রেস্টুরেন্টগুলোর জন্য কর দেওয়ার নিয়ম সহজ করা হবে। কোনো জটিল হিসাব ছাড়াই তাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট এবং নামমাত্র ‘ফ্ল্যাট রেট’ কর ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জটিল খাতা মেইনটেইন করার ঝামেলা থেকে মুক্তি পাবেন।
কর প্রশাসনের কর্মকর্তা ও পরিদর্শকদের বিরুদ্ধে করদাতাদের দীর্ঘদিনের হয়রানি ও ঘুষের যে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তা বন্ধে বড় নীতিগত পরিবর্তন আসছে। রাজস্ব আদায়ের পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটালাইজড করে একটি নতুন স্বাধীন কর প্রশাসন কাঠামো গঠনের কাজ চলছে। এর ফলে করদাতা ও কর কর্মকর্তার সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ কমে আসবে, যা দুর্নীতি প্রতিরোধ করবে।
গোলটেবিলে শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ
অর্থনৈতিক সংকটের এই সময়ে আয়োজিত এই গোলটেবিল আলোচনায় দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও চিন্তাবিদদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা অর্থমন্ত্রীর এই সংস্কার পরিকল্পনাকে স্বাগত জানালেও তা মাঠ পর্যায়ে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। নীতিমালার দ্রুত বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন তারা।
আলোচনায় অংশ নিয়ে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) চেয়ারপারসন ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সংকটকালীন এই সময়ে সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যস্ফীতি কমানো। যেকোনো অর্থনৈতিক সংস্কারের সুফল যেন সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেটে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য তার মূল্যায়নে বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান সূচকগুলো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এই অবস্থায় বন্ড মার্কেট সচল করা এবং কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে কর প্রশাসনে কেবল ছোটখাটো পরিবর্তন নয়, বরং বড় ধরণের কাঠামোগত অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না বাড়ালে বন্ডের লক্ষ্য পূরণ কঠিন হবে।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) বিশিষ্ট ফেলো সেলিম জাহান এবং এইচএসবিসি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব উর রহমানও আলোচনায় অংশ নেন। তারা দেশের ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট কাটানো এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আরও বেশি কঠোর হওয়ার জন্য অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা ব্যবসা সহজ করার প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়ন চান।
নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি বর্তমান প্রশাসনের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরীক্ষা। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ঘোষিত ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড’ এবং কর কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের এই রূপরেখা যদি সত্যিই আগামী এক বছরের মধ্যে দৃশ্যমান করা যায়, তবে তা দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে। অন্যথায়, কেবল নীতিমালার কাগজে কলমে পরিবর্তন সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

