রাজধানীর পল্লবীর একটি বহুতল ভবনের নিচতলায় তখনো রক্তের দাগ পুরোপুরি শুকায়নি। ক্ষণে ক্ষণে উৎসুক মানুষের ভিড় জমছে মিরপুর-১১ নম্বরের সেই গলিটায়। বাতাসে ভাসছে এক চিলতে আতঙ্ক আর গভীর স্তব্ধতা। ঠিক এর উল্টো চিত্র দেখা গেল মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের একটি গ্রামীণ কবরস্থানে।
গত রাতে এশার নামাজের পর যখন আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারের নিথর দেহটি মাটির নিচে নামানো হচ্ছিল, তখন উপস্থিত কারো চোখই শুকনো ছিল না। বুক ফাটা আর্তনাদ আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছিল গ্রামের আকাশ। দাদা-দাদির কবরের ঠিক পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণির এই অবুঝ শিক্ষার্থীকে।
রাজধানীর বুকে ঘটে যাওয়া এই নৃশংসতার শিকার পরিবারটি এখন পুরোপুরি বিধ্বস্ত। হারিয়ে যাওয়া সন্তানের শোক সইতে না পেরে পাগলপ্রায় রামিসার বাবা-মা। মিরপুরের ভাড়া বাসায় তারা এখন নির্বাক, নিথর। যেন ঘরের চারপাশের দেয়ালে এখনো লেগে আছে তাদের আদরের মেয়ের চঞ্চল পায়ের আওয়াজ।
‘আমার বোনটাকে বাঁচাতে পারলাম না’
রামিসার চাচাতো ভাই ফেরদৌস সুলতান আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে পল্লবীর বাসার সামনে গণমাধ্যমকর্মীদের দেখে আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না। ডুকরে কেঁদে উঠে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন এই তরুণ।
পারিবারিক এই দুঃস্বপ্নের বর্ণনা দিতে গিয়ে ফেরদৌস বলেন, “আমি তো বাসার ঠিক পাশের রাস্তাটাতেই দাঁড়িয়ে ছিলাম ভাই। কিন্তু ভেতরে যে কী হচ্ছিল, একটুও টের পাইনি। আমার চোখের সামনে দিয়ে আমার ছোট বোনটাকে কুত্তার মতো ছিঁড়ে খেলো পাষাণরা। আমি একটুও টের পেলাম না, আমার বোনটাকে বাঁচাতে পারলাম না রে ভাই।”
খানিকটা সময় চুপ থেকে ভেতরের জমে থাকা ক্ষোভ উগড়ে দিলেন ফেরদৌস। তিনি বলেন, “কী পৈশাচিক ঘটনা! ফেসবুকে আর পত্রিকায় ওর ছবিটা দেখে আমার নিজের ভেতরটা কেমন করছে। আমরা ঘাতক সোহেলের ফাঁসি চাই। এই পশুর মৃত্যুদণ্ড দেখতে চাই। ফাঁসির ওপরেও যদি কোনো কঠিন সাজা থাকতো, আমরা সরকারের কাছে সেই সাজাই দাবি করতাম।”
তিনি জানান, তার চাচা আর চাচি এখন পুরোপুরি শয্যাশায়ী। কারো সঙ্গে কথা বলার মতো মনের জোর বা শারীরিক শক্তি তাদের নেই। রামিসার মা কিছুক্ষণ পর পর মেয়ের ব্যবহৃত ছোট ছোট জামা, খেলনা আর পড়ার বই বুকে আঁকড়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠছেন।
ছেঁড়া স্যান্ডেল পরা বাবার শেষ উপহার
কান্না চেপে রাখতে পারছিলেন না রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লাও। পেশায় সাধারণ এক দিনমজুর এই মানুষটি নিজের জীবনের সব সুখ বিসর্জন দিয়েছিলেন দুই মেয়ের মুখে হাসি ফোটাতে।
চোখের পানি মুছতে মুছতে ভাঙা গলায় তিনি বলেন, “মেয়েটা ছিল আমার বাম পাশের হৃদপিণ্ড। নিজে কতদিন ছেঁড়া স্যান্ডেল পইরা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি, কিন্তু মেয়েদের কখনো কোনো কিছুর অভাব বুঝতে দিই নাই। দুই দিন আগেই তো মেয়েটা আমার কাছে আবদার করল, বাবা আমাকে একটা বোরকা কিনে দাও না।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে হান্নান মোল্লা বলেন, “মেয়ের শখ পূরণ করতে কত কষ্ট করে নিউমার্কেট থেকে এক হাজার টাকা দিয়ে লাল রঙের একটা বোরকা কিনে আনলাম। বোরকাটা ঘরেই রয়ে গেল ভাই। কিন্তু এটা পরার মতো মানুষটা তো আর দুনিয়াতে নাই। এখন এই বোরকা আমি কাকে পরাব?”
কথাটি শেষ করেই সন্তান হারানোর তীব্র বেদনায় হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি। পরে নিজেকে কিছুটা সামলে চরম অভিমান আর ক্ষোভে বলেন, “আমার এই কলিজার টুকরাকে কীভাবে নৃশংসভাবে কষ্ট দিয়ে মারলো ওরা। আমি আর এই দুনিয়ায় কারো কাছে বিচার চাই না। আল্লাহ আমার মেয়েকে ভালো রাখুক, তিনি তার কাছে নিয়ে গেছেন।”
জুতো দেখেই মেলে লাশের সন্ধান
পল্লবী থানা পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ মে সকাল আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে ঘটনাটির সূত্রপাত। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা সকালের খাবার খেয়ে বাসা থেকে সামান্য দূরত্বের একটি দোকানে যাওয়ার জন্য বের হয়েছিল।
তদন্তকারীরা জানান, আগে থেকেই ওত পেতে থাকা প্রতিবেশী মাদকাসক্ত যুবক মো. সোহেল রানা পথ থেকে রামিসাকে ফুসলিয়ে তার নিজস্ব ফ্ল্যাটের ভেতরে নিয়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ ধরে মেয়ে ঘরে না ফেরায় বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা প্রতিবেশীদের নিয়ে এলাকায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
একপর্যায়ে দুপুর ১২টার দিকে সন্দেহভাজন প্রতিবেশী সোহেল রানার বন্ধ দরজার সামনে রামিসার চটি জুতো জোড়া পড়ে থাকতে দেখেন তার বাবা। হান্নান মোল্লা দরজায় ধাক্কা দিলে ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ মেলেনি। এতে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।
পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় কুড়াল দিয়ে দরজার লক ভেঙে ঘরের ভেতর ঢোকেন তারা। পুরো ঘর ওলটপালট করার পর খাটের নিচে চোখ যেতেই আঁতকে ওঠেন বাবা। সেখানে পড়ে ছিল রামিসার মাথাবিহীন রক্তাক্ত দেহ। আর ঘরের কোণে রাখা একটি লাল রঙের প্লাস্টিকের বালতির ভেতরে রাখা ছিল তার বিচ্ছিন্ন মাথাটি।
বাথরুমে আটকে রেখে পাশবিকতা
এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি লিখিত মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারসহ মোট তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। অপর একজন এখনো অজ্ঞাতনামা।
মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেছেন, প্রধান আসামি সোহেল রানা তার হীন ও পৈশাচিক কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে শিশু রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। পরবর্তী সময়ে এই জঘন্য অপরাধ আড়াল করার জন্যই সে ঘর থেকে ধারালো ছুরি এনে ঠান্ডা মাথায় শিশুটির গলা কেটে দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
নৃশংসতা ঢাকতে সোহেল রানা শিশুটির দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক কেটে ফেলে শরীরটি খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে। এই পুরো হত্যাকাণ্ডে সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার এবং অপর এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি সরাসরি সহায়তা ও পাহারা দিয়েছে বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘটনার পরপরই ঘাতক সোহেল রানা ঘরের পেছনের জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও পুলিশ প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাকে বাগে আনে। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকার একটি গোপন আস্তানা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পল্লবী থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল।
ইয়াবা সেবন ও নৃশংসতার ভয়ংকর বর্ণনা
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া রিপন মামলার অগ্রগতির বিষয়ে আজ বিকেলে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি জানান, ঘটনার দিন সকালে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা ইয়াবা সেবন করে চরম উগ্র মেজাজে ছিল।
এসআই রিপন বলেন, “সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সোহেল প্রথমে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে একটি কক্ষে আটকে রেখে বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়। এরপর রামিসাকে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে ফ্ল্যাটের ভেতরে নিয়ে আসে। এই সময় সোহেলের সঙ্গে আরও এক যুবক ছিল বলে আমরা প্রমাণ পেয়েছি।”
তিনি আরও জানান, রামিসা যাতে চিৎকার করতে না পারে, সেজন্য ঘাতকেরা প্রথমে ওড়না দিয়ে তার মুখ শক্ত করে বেঁধে ফেলে। এরপর বাথরুমে নিয়ে তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শিশুটি অচেতন হয়ে পড়লে ধারালো দা দিয়ে তার গলা কাটা হয়।
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। পরিবার ও প্রতিবেশীরা যখন রামিসার খোঁজে বাইরে থেকে দরজায় উপর্যুপরি আঘাত করছিলেন, তখন সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না ভেতর থেকে দরজা খোলেননি। বরং তিনি সময় ক্ষেপণ করে তার স্বামী ও সহযোগীকে জানালার গ্রিল দিয়ে পালিয়ে যেতে সরাসরি সাহায্য করেন।
পরে স্থানীয় বাসিন্দারা ঘরের ভেতর এই বীভৎস দৃশ্য দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা তাৎক্ষণিকভাবে স্বপ্না আক্তারকে ঘরের ভেতরেই আটকে রেখে পুলিশে সোপর্দ করেন। বর্তমানে স্বপ্নার মোবাইল ফোন জব্দ করে তার কল রেকর্ড খতিয়ে দেখছে সিআইডির ফরেনসিক টিম।
আদালতে দায় স্বীকার, খুনিরা কারাগারে
এদিকে, মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাকে আজ দুপুরে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাঈদের আদালতে হাজির করা হয়। আদালতের এজলাসে দাঁড়িয়ে নিজের করা এই পৈশাচিক অপরাধের কথা স্বীকার করে লোমহর্ষক জবানবন্দি দেয় সে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সোহেল স্পষ্ট জানিয়েছে, সে একাই রামিসার গলা কেটেছে। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে বিজ্ঞ বিচারক তাকে সরাসরি কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে, এই হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা ও আলামত গোপনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও ঢাকার আরেক মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হকের আদালতে হাজির করা হয়েছিল। আদালত তাকেও জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।
পল্লবী এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, এই এলাকায় ইদানীং মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সোহেল রানা দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিবেশীরা। তারা অবিলম্বে এই মামলার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের দাবি জানিয়েছেন।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ৮ বছরের একটি শিশুকে যেভাবে ঘরের ভেতর টেনে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হলো, তা পুরো সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের চরম বহিঃপ্রকাশ। এই ধরণের সংবেদনশীল মামলায় যদি দৃষ্টান্তমূলক ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে শাস্তি কার্যকর না হয়, তবে অপরাধীদের সাহস আরও বেড়ে যাবে। প্রশাসন আশ্বাস দিয়েছে, খুব দ্রুতই এই মামলার চার্জশিট আদালতে পেশ করা হবে।

