রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির এক অবুঝ শিশু শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ৭ বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারের এই বর্বরোচিত মৃত্যুর ক্ষত এখনো দগদগে। আর এই চরম শোকাবহ পরিস্থিতিতে গভীর সমবেদনা জানাতে ভুক্তভোগী পরিবারটির পাশে সরাসরি গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাতের প্রথম প্রহরেই সরকারপ্রধানের মিরপুর-১১ নম্বরে অবস্থিত রামিসার পল্লবীর নিজ বাসভবনে যাওয়ার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং এবং দায়িত্বশীল সরকারি সূত্র ইতিমধ্যেই এই স্পর্শকাতর সফরের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে। রাষ্ট্র ও সমাজকে কাঁপিয়ে দেওয়া এই হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারের প্রতি ব্যক্তিগতভাবে সান্ত্বনা দিতেই প্রধানমন্ত্রীর এই ঝটিকা সফর।
নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো জানিয়েছে, আজ সন্ধ্যায় সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সরকারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নিয়মিত মন্ত্রিপরিষদ সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। রাষ্ট্রীয় ও নীতিনির্ধারণী এই দীর্ঘ বৈঠক শেষ হওয়া মাত্রই সরকারপ্রধানের গাড়ি বহর পল্লবীর উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখা হয়।
রামিসার শোকাতুর বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করে প্রধানমন্ত্রী কেবল সান্ত্বনাই দেবেন না, বরং রাষ্ট্র যে তাদের এই চরম বিপদে ও অসহায়ত্বে পাশে রয়েছে—সেই বার্তাটি সরাসরি পৌঁছে দেবেন। একটি ফুটফুটে শিশুর এই ধরনের অকাল ও নৃশংস চলে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না, সরকারপ্রধান তার এই সফরের মাধ্যমে সেই কঠোর অবস্থানটিই প্রকাশ করতে যাচ্ছেন।
এই বিশেষ সফরটির সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ও খুঁটিনাটি জানতে যোগাযোগ করা হয়েছিল বিএনপির মিডিয়া সেলের জ্যেষ্ঠ সদস্য শায়রুল কবির খানের সঙ্গে। তিনি অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো ঘড়ির কাঁটা বা প্রটোকলের সময় উল্লেখ করতে পারেননি।
শায়রুল কবির খান জানান, “প্রধানমন্ত্রী আজ রাতেই নিহত শিশু রামিসার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পল্লবীর বাসভবনে যাচ্ছেন, এটি নিশ্চিত। তবে মন্ত্রিপরিষদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি শেষ হতে কিছুটা সময় লাগছে। তাই সুনির্দিষ্টভাবে ঠিক কোন মিনিটে তিনি পৌঁছাবেন, তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি পুরোপুরি জেনে আমি পরে গণমাধ্যমকে অবহিত করব।”
পল্লবীর এই বুক ভাঙা ঘটনাটি ঘটেছিল গত মঙ্গলবার (১৯ মে)। শিশু রামিসাকে পাশের একটি ফ্ল্যাটে অত্যন্ত জঘন্যভাবে পাশবিক নির্যাতন চালানোর পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর থেকেই পুরো মিরপুর এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলছে।
অবশ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনার পরপরই বেশ তৎপর ভূমিকা দেখিয়েছে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মূল ঘাতক সোহেল রানা ও তার স্ত্রীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। গতকাল বুধবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হলে মূল আসামি ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে লোমহর্ষক জবানবন্দি দিয়েছে।
রামিসার এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড দেশের আইন ও বিচার বিভাগকেও বেশ নাড়া দিয়েছে। আজ সকালেই আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পৃথক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই বিষয়ে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
আইনমন্ত্রী ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকে স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়েছেন, যেন আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই মামলার নিখুঁত ও চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হয়। সরকার চাচ্ছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের অধীনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই নরপিশাচের দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসির রায় নিশ্চিত করতে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, দেশের চলমান আইনশৃঙ্খলার এই ক্রান্তিকালে খোদ সরকারপ্রধানের ভুক্তভোগী পরিবারের ঘরে ছুটে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কেবল একটি সাধারণ সান্ত্বনা সফর নয়, বরং এটি অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলের একটি কড়া পরোক্ষ হুঁশিয়ারি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ব্যক্তিগত উপস্থিতি যেমন সন্তানহারা বাবা-মায়ের হৃদয়ের রক্তক্ষরণকে কিছুটা হলেও উপশম দেবে, ঠিক তেমনি মাঠ পর্যায়ের পুলিশ প্রশাসনকেও মামলাটির দ্রুত ও প্রভাবমুক্ত তদন্ত শেষ করতে এক বড় মনস্তাত্ত্বিক চাপ দেবে। সাধারণ নাগরিকেরা এখন একটাই আশা করছেন—প্রধানমন্ত্রীর এই স্পর্শের পর যেন রামিসার খুনিদের বিচার কোনো আইনি মারপ্যাঁচে আটকে না থাকে।

