দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মাঠ পর্যায়ে তাদের দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবে। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এবং সরকারের চাহিদা অনুযায়ী সেনাসদস্যরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়োজিত থাকবেন বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকালে কুমিল্লা সেনানিবাসে আয়োজিত এক সামরিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেওয়ার সময় সেনাপ্রধান বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন। ৩৩ পদাতিক ডিভিশনের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত সেনাবাহিনীর আন্তঃফরমেশন ফায়ারিং প্রতিযোগিতা-২০২৬ এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান মাঠ পর্যায়ের সেনা মোতায়েন নিয়ে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। তিনি বলেন, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার তাগিদে সেনাবাহিনী এখনো দেশের বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন রয়েছে। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ দায়িত্ব তারা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করে আসছেন।
বর্তমানে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানান, এখনো সারা বাংলাদেশের ৬২টি জেলায় প্রায় ১৬ থেকে ১৭ হাজার সেনাসদস্য সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমান্বয়ে উন্নতি হওয়ায় ইতিমধ্যে অনেক সৈনিককে মাঠ পর্যায় থেকে প্রত্যাহার করে সেনানিবাসে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তবে মাঠ পর্যায় থেকে সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়াটি এখনো সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। এ প্রসঙ্গে সেনাপ্রধান আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “ইনশাআল্লাহ আমরা আশা করছি যে খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে আমাদের সব সদস্য ব্যারাকে ফেরত আসতে পারবেন। তবে ব্যারাকে ফেরার পরও দেশের যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে আমাদের কিছু কাজ করে যেতেই হবে।”
তিনি স্পষ্ট করে জানান, বেসামরিক প্রশাসন ও সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি চাইবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ কাজে তারা সহায়তা দিয়ে যাবেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন।
বর্তমানে দেশের প্রধান প্রধান ফুয়েল ডিপো বা জ্বালানি মজুত কেন্দ্রগুলোতে সেনাবাহিনীর বিশেষ মোতায়েন রয়েছে। সেনাপ্রধান বলেন, এই ধরনের স্পর্শকাতর ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সুরক্ষায় সেনাবাহিনীকে কাজ করতে হচ্ছে। সময় ও পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন মেয়াদে সরকারকে এই ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।
মাঠ পর্যায়ের এই দীর্ঘকালীন দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর মূল পেশাদারিত্বের দিকেও নজর দেওয়ার সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি বলেন, একটি পেশাদার বাহিনীর প্রধান কাজ হলো সেনানিবাসে ফেরত এসে নিয়মিত কঠোর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা এবং যেকোনো সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য নিজেদের প্রস্তুত রাখা।
বিগত মাসগুলোতে মাঠ পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলার ডিউটিতে অতিরিক্ত ব্যস্ত থাকার কারণে বাহিনীর নিয়মিত প্রশিক্ষণ কিছুটা ব্যাহত হয়েছিল। সেনাপ্রধান জানান, সেনাবাহিনীর নিজস্ব যে যুদ্ধকৌশল ও প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি রয়েছে, সেগুলো এখন সেনানিবাসগুলোতে আস্তে আস্তে পুরোদমে শুরু করতে হবে।
একটি সামরিক বাহিনীর জন্য ফায়ারিং বা লক্ষ্যভেদের দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। দীর্ঘ সময় মাঠের ডিউটিতে ব্যস্ত থাকার পরও সৈনিকদের এই মৌলিক দক্ষতায় কোনো ঘাটতি তৈরি হয়নি বলে সন্তোষ প্রকাশ করেন সেনাপ্রধান। এবারের প্রতিযোগিতার ফলাফল ও সৈনিকদের নিশানার মান দেখে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী।
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, “আমরা এতদিন মাঠের নানাবিধ কাজের চাপে ফায়ারিং অনুশীলন সেভাবে করতে পারিনি। তবে এবার ফায়ারিং প্রতিযোগিতা শেষে আমি সৈনিকদের যে অসামান্য দক্ষতা ও নিশানা দেখলাম, তাতে আমি অত্যন্ত আশান্বিত। এতদিন ফিল্ডে থাকার পরেও আমাদের ফায়ারিং সক্ষমতা একটুও কমেনি।”
সামরিক কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, এই দক্ষতা ধরে রাখা একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য অত্যন্ত ভালো লক্ষণ। এখন থেকে সেনানিবাসগুলোতে অন্যান্য সব নিয়মিত ট্রেনিং ইভেন্টগুলোও পর্যায়ক্রমে শুরু করা হবে। সেনাবাহিনীর মূল কাজ যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া এবং অভ্যন্তরীণ ডিসিপ্লিন ঠিক রাখা—এই দুটি বিষয়ের ওপর এখন সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে।
বক্তব্য শেষে সেনাপ্রধান প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে বিজয়ী এবং রানারআপ দলের সদস্যদের মাঝে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রফি ও মেডেল বিতরণ করেন। নিখুঁত নিশানার মাধ্যমে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখা সেনাসদস্যদের তিনি ব্যক্তিগতভাবে অভিনন্দন জানান এবং তাদের পেশাদারিত্বের প্রশংসা করেন।
সেনাসদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ মে কুমিল্লা সেনানিবাসের ৩৩ পদাতিক ডিভিশনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় এই ঐতিহ্যবাহী ফায়ারিং প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই টুর্নামেন্টে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অঞ্চলের ফরমেশন, লজিস্টিকস এরিয়া এবং স্পেশাল ফোর্সসহ মোট ১৭টি শক্তিশালী দল অংশ নেয়।
অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে ছিল সেনাবাহিনীর পাঁচটি স্বতন্ত্র ব্রিগেড এবং দেশের গৌরব প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড। পাঁচ দিনব্যাপী চলা এই প্রতিযোগিতায় নিখুঁত নৈপুণ্য প্রদর্শন করে ১৭ পদাতিক ডিভিশন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। অন্যদিকে, তুমুল লড়াই করে প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড রানারআপ ট্রফি নিজেদের করে নেয়।
কুমিল্লা সেনানিবাসের এই সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা, স্থানীয় পদস্থ কর্মকর্তাগণ এবং বিভিন্ন পদমর্যাদার বিপুল সংখ্যক সেনাসদস্য উপস্থিত ছিলেন। সেনাপ্রধানের এই সফর ও বক্তব্য মাঠ পর্যায়ের সৈনিকদের মনোবল বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

