চট্টগ্রাম মহানগরীর বাকলিয়া এলাকায় তিন বছরের এক অবুঝ শিশুকে ধর্ষণের পৈশাচিক অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযুক্ত যুবককে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবিতে একটি বহুতল ভবন ঘেরাও করে বিক্ষোভ করছেন শত শত মানুষ। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত যে, অভিযুক্তকে নিরাপদ হেফাজতে নিয়ে আসতে গিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার বাধার মুখে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে খোদ পুলিশ বাহিনী।
আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) বিকেল ৫টার দিকে বাকলিয়া থানার চেয়ারম্যানঘাটা এলাকার আবু জাফর রোডে এই লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বিকেলে ওই অবুঝ শিশুটির ওপর পাশবিক নির্যাতনের বিষয়টি জানাজানি হয়। মুহূর্তের মধ্যে খবরটি পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে শত শত সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। তারা অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন।
খবর পেয়ে বাকলিয়া থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। তারা জানতে পারে, অভিযুক্ত যুবক ওই এলাকার একটি ভবনের ভেতরে আত্মগোপন করে আছে। পুলিশ সদস্যরা ভবনে ঢুকে তাকে আটক করার চেষ্টা করলে বাইরে জড়ো হওয়া হাজারো মানুষ বাধা সৃষ্টি করেন।
বিক্ষুব্ধ জনতার দাবি, পুলিশ যেন কোনোভাবেই অপরাধীকে আড়াল করার সুযোগ না পায়। তারা ভবনটির চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেন এবং পুলিশকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করতে পুলিশ কর্মকর্তারা বারবার চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
সন্ধ্যা সাতটায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুলিশ অভিযুক্ত যুবককে ওই ভবন থেকে বের করে থানায় নিয়ে আসতে পারেনি। জনতা ভবনের মূল ফটক ও আশেপাশের রাস্তা পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে ঘটনার পরপরই ভুক্তভোগী মারাত্মক আহত শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে শিশুটি হাসপাতালের বিশেষায়িত ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) চিকিৎসাধীন রয়েছে।
ওসিসি সূত্রে জানা গেছে, শিশুটির শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। চিকিৎসকদের একটি বিশেষ দল তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। একই সঙ্গে তার প্রয়োজনীয় আইনি আলামত সংগ্রহের প্রক্রিয়াও চলছে।
ঘটনার ভয়াবহতা ও উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার হোসেইন মোহাম্মদ কবির ভুঁইয়া। তিনি জানান, পুলিশের মূল লক্ষ্য এখন দুটি— শিশুটির সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা।
উপকমিশনার বলেন, “আমরা শিশুটিকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি করেছি। সেখানে তার চিকিৎসা চলছে। অন্যদিকে, আবু জাফর রোডের ঘটনাস্থলে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত পুলিশ মোতিয়েন করা হয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “স্থানীয় মানুষ ধারণা করছেন অভিযুক্ত যুবক একটি নির্দিষ্ট ভবনের ভেতরেই অবস্থান করছে। তারা সেটি ঘেরাও করে রেখেছেন এবং কাউকে বের হতে দিচ্ছেন না। আমি নিজে পরিস্থিতির তদারকি করতে সেখানে যাচ্ছি। যেকোনো মূল্যে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হবে।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্থানীয় প্রবীণ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিক্ষুব্ধ জনতাকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন। তারা বলছেন, আইন নিজের হাতে না তুলে নিয়ে পুলিশকে তার কাজ করতে দেওয়া উচিত। তবে উত্তেজিত জনতা অপরাধীর তাৎক্ষণিক শাস্তি দাবি করছেন।
আবু জাফর রোডের একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তিন বছরের একটা বাচ্চার সাথে এই রকম জানোয়ারের মতো কাজ কেউ করতে পারে? আমাদের ক্ষোভ পুলিশের ওপর নয়, এই সমাজবিরোধী অপরাধীর ওপর। আমরা চাই না ও কোনোভাবে পালিয়ে যাক।”
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই ধরণের জঘন্য অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। তাই তারা এবার প্রথম থেকেই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন যেন প্রশাসন কোনো রকম ঢিলেঢালা ভাব দেখানোর সুযোগ না পায়।
চট্টগ্রামে গত কয়েক দিনে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। এই ঘটনার ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ বুধবার চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় পাঁচ বছরের আরেক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে এক মাদরাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
সাতকানিয়ার সেই ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুর পরিবার থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করার পর থেকেই ওই শিক্ষক পলাতক রয়েছেন। তাকে ধরতে পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।
পরপর দুই দিনে চট্টগ্রামের দুটি আলাদা এলাকায় দুটি অবুঝ শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনায় পুরো জেলা জুড়ে অভিভাবক মহলে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই নিয়ে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভের ঝড় বইছে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, শিশুদের সুরক্ষায় সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি এই ধরণের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় সমাজকে এই নৈতিক অবক্ষয় থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে না।
বাকলিয়ার চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ভবনটির ভেতরে থাকা যুবকের পরিচয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি পুলিশ। তবে স্থানীয়রা তার নাম-পরিচয় নিশ্চিত করেই বিক্ষোভ করছেন।
সিএমপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জনতাকে শান্ত করে সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আসামিকে থানায় নিয়ে যাওয়া হবে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা যেন না ঘটে, সে জন্য পুলিশ সর্বোচ্চ ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।

