রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পুলিশকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের মনে যে গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে, তার একমাত্র জবাব হবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন করা।
আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সরকারের এই কঠোর অবস্থানের কথা জানান। তিনি বলেন, অপরাধীদের দ্রুত সাজার মুখোমুখি করতে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো ধরনের সময়ক্ষেপণ বরদাশত করবে না।
সম্প্রতি দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় এখনো কার্যকর না হওয়া নিয়ে সাংবাদিকেরা মন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রাখেন। জানতে চাওয়া হয়, বিচারপ্রক্রিয়ার এই চেনা দীর্ঘসূত্রতা সমাজে নতুন নতুন অপরাধকে উৎসাহিত করছে কি না?
জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, “আছিয়ার বাবার মনে যে হতাশা তৈরি হয়েছে, তা একজন সন্তানহারা পিতার ব্যক্তিগত এবং স্বাভাবিক অনুভূতি। তার এই ক্ষোভকে আমরা শ্রদ্ধা জানাই। তবে সরকার বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করতে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।”
তিনি বিগত দিনের পরিসংখ্যান টেনে বলেন, আছিয়ার ঘটনার পর মাত্র সাত দিনের মধ্যে পুলিশ চার্জশিট দিয়েছিল। এমনকি এক মাসের মধ্যে বিচারিক আদালতের সব প্রক্রিয়া শেষ হয়েছিল। এর চেয়ে দ্রুত বিচার করতে গেলে আইনগতভাবে তা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে দেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামোর জটিলতার কথা উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। তিনি জানান, ট্রায়াল কোর্টে মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ার পরই তা কার্যকর করা যায় না। নিয়ম অনুযায়ী ডেথ রেফারেন্স অনুমোদনের জন্য সুপ্রিম কোর্টে পাঠাতে হয়।
উচ্চ আদালতে যেকোনো মামলার পেপার বুক প্রস্তুত করার একটি নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা বা সিরিয়াল রয়েছে। এই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময় চূড়ান্ত রায় আসতে এবং তা কার্যকর হতে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বিলম্ব ঘটে।
তবে রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল মামলায় এই নিয়মের ব্যতিক্রম করার নজির রয়েছে বলে স্মরণ করিয়ে দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড এবং বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার ক্ষেত্রে বিশেষ অনুমতি নিয়ে দ্রুত পেপার বুক তৈরি করা হয়েছিল।
রামিসা ও আছিয়া হত্যা মামলার ক্ষেত্রেও সরকার একই ধরনের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। আইনমন্ত্রী বলেন, “আজ মন্ত্রণালয়ে এসেই আমি প্রথম কাজটি করেছি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে ফোন করা। তাকে স্পষ্ট বলেছি, এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার ব্যবস্থা করতে।”
এই বিষয়ে স্বরাষ্ট্র সচিবের সঙ্গেও তার বিস্তারিত কথা হয়েছে বলে জানান তিনি। আইনমন্ত্রী বলেন, “আমরা এই মামলাটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি। রামিসার বাবা যে হতাশা প্রকাশ করেছেন, তার একমাত্র উত্তর হবে যদি আমরা এই বিচার প্রক্রিয়াটাকে প্রত্যাশিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে পারি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “এর বাইরে আমাদের মুখে বলার বা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর কিছু নেই। আমরা যদি দ্রুত এই বিচার নিশ্চিত করতে না পারি, তবে উনার ক্ষোভই সত্য প্রমাণিত হবে। কাজ দিয়ে উনার সেই কথার জবাব দেওয়াই এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”
সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আছিয়ার মামলাটি বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি বড় উদাহরণ। এক মাসের মধ্যে সেই বিচার শেষ করা সম্ভব হয়েছিল। সেই দৃষ্টান্তকে সামনে রেখেই রামিসা হত্যাকাণ্ডের বিচার এগিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছে মন্ত্রণালয়।
তবে রায় ঠিক কতদিনের মধ্যে কার্যকর হবে—এমন সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে কিছুটা সীমাবদ্ধতার কথা জানান আইনমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করেন যে, রায় কার্যকরের বিষয়টি সরাসরি সরকারের নির্বাহী বিভাগের হাতে থাকে না। এটি সম্পূর্ণ সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ার।
তিনি বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক প্রক্রিয়ায় কোনোভাবেই সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারে না এবং করবেও না। তবে সুপ্রিম কোর্টে পেপার বুক করার ক্ষেত্রে কিছু আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও নিম্ন আদালতে বা ট্রায়াল কোর্টে তেমন কোনো বাধা নেই।”
আইনমন্ত্রী বলেন, “আমি আমার পাবলিক প্রসিকিউটরদের (পিপি) নির্দেশ দিতে পারি মামলাটিকে ফাস্টট্র্যাকে বা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাকি আইনগত বিষয়গুলো বিজ্ঞ বিচারক নিজেই খতিয়ে দেখবেন।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে সরকার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে পারে। তবে আদালতের স্বাধীন বিচারিক কাজে হস্তক্ষেপ করার কোনো সুযোগ সংবিধানে রাখা হয়নি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালেই রামিসা হত্যার বিচার হবে।
দেশের সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার ওপর চেপে বসা মামলা জটের প্রসঙ্গও এদিন মন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে। তিনি স্বীকার করেন, বর্তমানে দেশের আদালতগুলোতে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ মামলার জট রাতারাতি বা জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়।
বিপুল এই মামলা জট কমিয়ে আনতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বলে দাবি করেন তিনি। বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো এবং আদালতগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন এই পরিকল্পনার অংশ বলে জানান মন্ত্রী।
সবশেষে রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে সরকারের নীতি পরিষ্কার করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, কোনো ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের মামলাকে কোনো অবস্থাতেই রাজনৈতিক মামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।
এসব জঘন্য অপরাধের মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহারের তালিকায় রাখার কোনো সুযোগ নেই বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দেন তিনি। রামিসা ও আছিয়ার মতো ঘটনাগুলোতে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকার শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে বলে আশ্বস্ত করেন আইনমন্ত্রী।

