রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ এবং ঐতিহ্যবাহী গাবতলী পশুর হাট এখন এক অদ্ভুত নীরবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চিরচেনা সেই হাঁকডাক, ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম আর ধুলো ওড়ানো ব্যস্ততা এখনো গাবতলী পশুর হাটে অনুপস্থিত।
আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রাকে ট্রাকে গরু, মহিষ ও ছাগল আসতে শুরু করেছে ঢাকার এই প্রবেশদ্বারে। তবে গাবতলী হাট পরিস্থিতি ঘুরে দেখা গেল, পশুর আগমন শুরু হলেও বেচাকেনার চাকা এখনো সচল হয়নি।
মাঠের এক প্রান্তে যখন বাঁশ ও খুঁটি পুঁতে শামিয়ানা টানানোর কাজ চলছে, অন্য প্রান্তে তখন অলস সময় পার করছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিক্রেতারা। কেউ গরুর মুখে খড় তুলে দিচ্ছেন, কেউ বা ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিয়েছেন হাটের কাঁচা মাটিতে।
কুষ্টিয়া থেকে মাত্র দুটি বড় জাতের গরু নিয়ে গত মঙ্গলবার গাবতলী হাটে এসেছেন প্রবীণ খামারি রমিজ উদ্দিন। হাটের এক কোণে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের লালচে রঙের বড় গরুটির গায়ে হাত বোলাচ্ছিলেন।
রমিজ উদ্দিনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, “১০ লাখ টাকা দাম চাচ্ছি দুইটা গরুর। মানুষ আইসা দেখে, হাত দেয়, চলেও যায়। দুই-একজন দামও বলছে, তবে নেওয়ার মতো আসল কাস্টমার এখনো বাজারে নামে নাই।”
তার মতো হাটে আসা সিংহভাগ বিক্রেতারই এখন একই দশা। তারা বলছেন, এখন যারা হাটে আসছেন, তারা মূলত কোরবানি ২০২৬ এর বাজার পরিস্থিতি ও গরুর দামের একটা প্রাথমিক ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
কুষ্টিয়া থেকেই আরেকটি বড় পশুর বহর নিয়ে এসেছেন আবুল হোসেন। তিনি সকালের দিকে প্রথম দফায় ২৬টি গরু নিয়ে গাবতলীর মাটিতে পা রেখেছেন। তবে এটি তার পুরো বহর নয়।
আবুল হোসেন জানান, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়ার সীমান্ত এলাকা থেকে তার আরও ৭৯টি গরু ঢাকার পথে রয়েছে। তিনি আশাবাদী যে, হাটে পশুর সংখ্যা যত বাড়বে, ঢাকার বাসিন্দারাও তত বেশি সংখ্যায় হাটে আসতে শুরু করবেন।
“এখনো তো সেইভাবে ভিড় শুরু হয় নাই। তবে ঢাকার মানুষ শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করে। গরু যখন মাঠ ভইরা যাইব, কাস্টমার তখন ঘরে বইসা থাকতে পারব না,” বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন আবুল হোসেন।
খামারি ও ব্যাপারীদের সাথে আলাপ করে জানা গেল, এবার কোরবানির পশুর দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি হাঁকা হচ্ছে। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে তারা পশুখাদ্যের অতিরিক্ত মূল্য এবং পরিবহন খরচের লাগামহীন বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন।
মেহেরপুর সদর উপজেলার ‘মেহেরপুর অ্যাগ্রো’র হিরা ব্যাপারী এবার বড় প্রস্তুতি নিয়ে গাবতলী হাটে এসেছেন। বর্তমানে তার খামারের ২৬টি মাঝারি ও বড় সাইজের গরু হাটের শেডে বাঁধা রয়েছে।
হিরা ব্যাপারী জানান, ঢাকার এই হাটে ভালো বিক্রির আশায় তিনি আরও ৮০টি গরু পর্যায়ক্রমে নিয়ে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে বাজারের বর্তমান ধীরগতি তাকে কিছুটা চিন্তায় ফেলেছে।
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থেকে ১৫টি দেশাল গরু নিয়ে হাটে এসেছেন জিয়া ব্যাপারী। তিনি প্রতি বছরই গাবতলী হাটে আসেন এবং ঢাকার ক্রেতাদের পছন্দের ধরণ তার বেশ ভালোভাবেই জানা রয়েছে।
জিয়া ব্যাপারী বলেন, “রাস্তায় জ্যাম আর ঝক্কি-ঝামেলা পার কইরা সকালে আইসা পৌঁছালাম। বেচাকেনা এখনো জমে নাই, তবে আশা হারাইতেছি না। ঈদের তো এখনো কয়েক দিন বাকি, এর মধ্যেই সব বিক্রি হইয়া যাইব।”
বাস্তব চিত্র বলছে, গাবতলীর বিশাল চত্বরে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ পশু এসেছে, তা হাটের ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশ কম। অধিকাংশ গরুই এসেছে গত রাতে কিংবা আজ সকালের দিকে।
জামালপুর থেকে আসা ব্যাপারী জাকারিয়া গতকাল একাই প্রায় ৮০টি গরু নিয়ে হাটে এসেছেন। বিশাল এই বহর নিয়ে হাটে আসার পেছনে তার যেমন বড় বিনিয়োগ রয়েছে, তেমনি রয়েছে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক চাপ।
ক্রেতা না থাকায় কিছুটা হতাশ জাকারিয়া বলেন, “টাকা-পয়সা খরচ কইরা গরু তো আনলাম। এখন কাস্টমার নাই, তাই আমাগো কাজ হইলো গরুরে খাওয়ানো আর নিজেরা ঘুমানো। এছাড়া আর করার কী আছে?”
তবে এই চেনা ও সাধারণ খবরের ভিড়ে গাবতলী হাটে এবার যুক্ত হয়েছে এক অভিনব ও চমকপ্রদ অফার। যা হাটে আসা সাধারণ দর্শনার্থী এবং ক্রেতাদের মধ্যে এক বিশাল কৌতূহল ও গুঞ্জনের জন্ম দিয়েছে।
কেরানীগঞ্জের লাকীচর এলাকা থেকে মজিবুর রহমান নামের এক খামারি একটি বিশাল আকৃতির কালো মহিষ নিয়ে হাটে হাজির হয়েছেন। প্রায় এক টন বা এক হাজার কেজি ওজনের এই মহিষটি দেখতে এখন মানুষের ভিড় জমছে।
মহিষটির বিশাল ও শক্তিশালী শারীরিক গঠন এবং চওড়া শিং দূর থেকেই যে কারও নজর কাড়ছে। মজিবুর রহমান এই দানবীয় আকৃতির মহিষটির দাম হাঁকছেন প্রায় ২৫ লাখ টাকা।
মজিবুর জানান, খামারে একে বড় করতে যে পরিমাণ যত্ন ও ব্যয়বহুল খাবার দিতে হয়েছে, সেই খরচের কথা বিবেচনা করেই এই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আসল চমক লুকিয়ে আছে তার বিক্রির কৌশলে।
ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে মজিবুর ঘোষণা দিয়েছেন—‘মহিষ কিনলে গরু ফ্রি’। অর্থাৎ, যে ক্রেতা ২৫ লাখ টাকা দিয়ে এই মহিষটি কিনবেন, তাকে কোরবানি দেওয়ার জন্য আলাদা করে কোনো গরু কিনতে হবে না।
এই অফারের আওতায় মজিবুর তার সাথে আনা প্রায় দুই মণ ওজনের একটি সুন্দর সাদা রঙের দেশি গরু সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ক্রেতার হাতে তুলে দেবেন। এই অভিনব অফারটি এখন গাবতলীর হাটের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।
হাটে আসা অনেক মধ্যবিত্ত ক্রেতা বলছেন, এটি একটি চতুর এবং আকর্ষণীয় বিপণন কৌশল। তবে ২৫ লাখ টাকা দিয়ে মহিষ কেনার মতো উচ্চবিত্ত ক্রেতা গাবতলীর মাঠে কবে আসবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
পশুর হাটে এই ধীরগতির পেছনে ঢাকার স্থানীয় ক্রেতাদেরও নিজস্ব কিছু যুক্তি রয়েছে। মিরপুর থেকে হাটে আসা এক বেসরকারি চাকরিজীবী জানান, তিনি কেবল বাজার দেখতে এসেছেন।
তার মতে, এখন কিনলে ঈদের দিন পর্যন্ত গরুর দেখভাল করা এবং রাখার জায়গা পাওয়া ঢাকার ফ্ল্যাট বাড়িগুলোতে এক বড় সমস্যা। তাছাড়া ক্রেতাদের একটা বড় অংশ মনে করেন, ঈদের ঠিক আগ মুহূর্তে গরুর দাম কিছুটা কমতে পারে।
ক্রেতাদের এই অপেক্ষার নীতির কারণে খামারিদের কপালে কিছুটা চিন্তার ভাঁজ পড়লেও, অভিজ্ঞ ব্যাপারীরা জানেন যে ঢাকার বাজার সবসময় শেষ দুই দিনেই চাঙ্গা হয়ে ওঠে। তখন দাম নিয়ে খুব একটা আপস করেন না ক্রেতারা।
গাবতলী হাট পরিচালনা কমিটির এক কর্মকর্তা জানান, হাটের সার্বিক নিরাপত্তা এবং বিক্রেতাদের সুবিধার্থে সব ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। জাল টাকা শনাক্তকরণ বুথ এবং সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর কাজও প্রায় শেষ।
তিনি আরও বলেন, “আমাদের হাটে দেশের সব অঞ্চল থেকে পশুর গাড়ি ঢুকছে। শুরুর দিকে বেচাকেনা একটু ধীরগতির থাকে, এটা স্বাভাবিক। আগামী শুক্রবার ছুটির দিন থেকে গাবতলী পশুর হাট তার চেনা রূপে ফিরবে।”
আপাতত, গাবতলী হাটের বিক্রেতারা এক দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। মহিষ কিনলে গরু ফ্রি-র মতো আকর্ষণীয় অফার কিংবা কুষ্টিয়া-মেহেরপুরের বড় বড় গরুর বহর—সবই এখন ঢাকার আসল ক্রেতাদের অপেক্ষায় মাঠ কামড়ে পড়ে রয়েছে।

