বুড়িগঙ্গার কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা পোস্তগোলা শ্মশানঘাট এলাকায় এখন শুধুই বাঁশ কাটার শব্দ আর খুরের আওয়াজ। ঢাকার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এই পশুর হাটে এরই মধ্যে এসে পৌঁছেছে শত শত কোরবানির পশু। চারদিকের বাতাসে এখন কাঁচা খড় আর গোবরের চেনা গন্ধ।
আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকার পশুর হাটগুলো সাজানোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাকে ট্রাকে গরু আসতে শুরু করেছে এই হাটে। তবে হাট জমতে এখনো কিছুটা সময় বাকি। ক্রেতাদের আনাগোনা শুরু হলেও পকেটের জোর আর গরুর দামের সমীকরণ মেলাতেই ব্যস্ত সবাই।
মাঠের খামারিরা জানিয়েছেন, এবার পশুখাদ্যের চড়া দামের কারণে গরুর দাম কিছুটা বাড়তি। পোস্তগোলা হাটে এখন সর্বনিম্ন ২ মণ ওজনের ছোট গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে, ১৬ থেকে ১৭ মণ ওজনের বড় রাজকীয় গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে ৮ থেকে সাড়ে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত।
আজ বুধবার (২০ মে) সকালে পোস্তগোলার এমসি সড়কের মাথা থেকে শুরু করে বুড়িগঙ্গার তীর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা ঘুরে দেখা যায় এক ব্যস্ত চিত্র। রাস্তার দুই পাশে মাইলের পর মাইল জুড়ে বাঁশের খুঁটি পোঁতা হয়েছে। ত্রিপল ও চট দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে অস্থায়ী ছাউনি।
পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের এই বিশাল হাটটি এবার ৪ কোটি ১ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন কাজী মাহবুব মওলা হিমেল। হাট কর্তৃপক্ষের বিশাল একটি দল মাঠের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। তারা বলছেন, এবার নিরাপত্তা ও অবকাঠামো তৈরিতে কোনো খামতি রাখা হচ্ছে না।
যদিও হাটের আয়তনের তুলনায় পশুর সংখ্যা এখনো কিছুটা কম, তবে বেপারিরা বলছেন এটি কেবল শুরু। উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল থেকে নদী ও সড়ক পথে আরও হাজার হাজার পশুবাহী গাড়ি ঢাকার দিকে আসছে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে পুরো মাঠ গরুতে সয়লাব হয়ে যাবে।
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থেকে বিশাল এক গরুর বহর নিয়ে এসেছেন নাসিম নামের এক খামারি। গত সোমবার রাতে তারা ঢাকার এই হাটে এসে পৌঁছান। নাসিম ও তার এলাকার কয়েকজন খামারি মিলে এবার সবমিলিয়ে ৪০০টি গরু নিয়ে এসেছেন পোস্তগোলা হাটে।
হতাশার সুরে নাসিম বলেন, “সোমবার থেইকা আইসা বইসা আছি ভাই। এখনো একটা গরুও বেচতে পারি নাই। মানুষজন খালি আইতাছে, দেখতাছে আর দামাদামি কইরা চইলা যাইতাছে। আসল কাস্টমার এখনো বাজারে নামে নাই। তবে আশা ছাড়ি নাই।”
নিজেদের বহরের সবচেয়ে বড় কালো কুচকুচে একটি গরু দেখিয়ে নাসিম বলেন, “এইটার দাম ধরছি সাড়ে ৮ লাখ টাকা। পিওর দেশি খাবার খাওয়াইয়া বড় করছি। কোনো ভেজাল নাই। শান্তশিষ্ট এই গরুটায় ১৬ থেইকা ১৭ মণের মতো সলিড মাংস হইবো।”
হাটের একটু ভেতরের দিকে সারি সারি ১০টি মাঝারি আকারের লাল গরু বেঁধে রেখেছেন কুষ্টিয়ার প্রবীণ খামারি কালাম মিয়া। এই গরুগুলোর প্রতি তার মায়া স্পষ্ট। কুষ্টিয়া থেকে ট্রাকে করে আনার সময়কার এক আবেঘন মুহূর্তের কথা মনে করলেন তিনি।
কালাম মিয়া বলেন, “আমগো এইগুলা সব পালের গরু। নিজের সন্তানের মতো দুই বছর ধইরা লালন-পালন করছি। বাড়ি থেকে যখন ট্রাকে তুলি, তখন বাড়ির মহিলারা কান্নাকাটি শুরু করে দিছিল। এই গরুগুলার দাম চাচ্ছি সাড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। একেকটায় ৮ থেইকা ৯ মণ মাংস হবে।”
বড় এবং মাঝারি গরুর পাশাপাশি এবার হাটে ছোট সাইজের দেশি গরুর চাহিদাও ব্যাপক। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ক্রেতারা যারা একা বা দুই-তিন জন মিলে কোরবানি দিতে চান, তারা ছোট গরুর খোঁজে পোস্তগোলার গলিতে গলিতে ঘুরছেন।
শরীয়তপুর থেকে ৩৫টি ছোট সাইজের গরু নিয়ে এসেছেন কাজী ওয়াদুদ। তিনি বলেন, “ছোট গরুর কাস্টমার বেশি। আমাদের গরুগুলো ৬০ থেকে ৯০ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হয়ে যাবে। এই সাইজের গরুতে প্রায় ২ মণের মতো ভালো মাংস পাওয়া যাবে। দামও মানুষের নাগালের মধ্যে।”
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর দক্ষিণ সিটি এলাকায় সবমিলিয়ে ১১টি অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শহরের মানুষের যাতায়াত ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই এই স্থানগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে।
অনুমোদিত হাটগুলোর মধ্যে রয়েছে—উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাবের খালি জায়গা, পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের পশ্চিম পাশের নদীর পাড়, রহমতগঞ্জ ক্লাবের খালি জায়গা, আমুলিয়া মডেল টাউন, শ্যামপুর এবং সিকদার মেডিকেল সংলগ্ন আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের খালি জায়গা।
এছাড়াও হাট বসবে শ্যামপুর-কদমতলী ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকা, কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ী পানির পাম্প পর্যন্ত অব্যবহৃত স্থান, সাদেক হোসেন খোকা মাঠের দক্ষিণ পাশ, মোস্তমাঝি মোড় সংলগ্ন গ্রীন বনশ্রী হাউজিং এলাকা এবং গোলাপবাগ আউটফল স্টাফ কোয়ার্টারের উত্তর পাশের খালি জায়গায়।
এবারের হাট ব্যবস্থাপনা নিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা নিয়মের ব্যত্যয় সহ্য করা হবে না। প্রতিটি হাটের ওপর থাকবে কর্পোরেশনের বিশেষ নজরদারি।
প্রশাসক বলেন, “আমাদের ১১টি হাট সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হবে। নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেও কোনো হাট বসতে দেওয়া হবে না। কোনো ইজারাদার বা ব্যবসায়ী যদি মূল সীমানার বাইরে গিয়ে রাস্তা দখল করে, তবে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে জোর দিয়ে তিনি আরও বলেন, “ঈদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা মাঠে নেমে পড়বেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঢাকাকে বর্জ্যমুক্ত করা হবে। এই কাজে ইজারাদারদেরও নিজস্ব জনবল দিয়ে সিটি কর্পোরেশনকে সাহায্য করতে হবে।”
পোস্তগোলা হাটের ইজারাদার পক্ষ জানিয়েছে, জাল টাকা শনাক্তকরণ মেশিন এবং সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে। বেপারিদের টাকা ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য হাটের কাছেই অস্থায়ী বুথ স্থাপনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যেন কোনো ছিনতাই বা প্রতারণার ঘটনা না ঘটে।
পশু চিকিৎসকদের একটি দলও হাটে নিয়মিত টহল দেবে বলে জানা গেছে। কোনো গরু দীর্ঘ জার্নির কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হবে। খামারিদের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং অস্থায়ী টয়লেটের ব্যবস্থাও করেছে হাট কর্তৃপক্ষ।
সাধারণত বাঙালি ক্রেতাদের একটা বড় প্রবণতা হলো, তারা একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। ঈদের আগের রাতে বা তার আগের দিন হাটে গিয়ে দাম যখন কিছুটা পড়ে যায়, তখন তারা গরু কেনেন। ব্যবসায়ীরাও এই মনস্তত্ত্ব ভালো করেই জানেন।
সব মিলিয়ে পোস্তগোলা হাটের মাঠ এখন পুরোপুরি প্রস্তুত। খামারিদের মুখে এখন ক্লান্তির ছাপ থাকলেও চোখে রয়েছে বড় লাভের স্বপ্ন। আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপরেই ঢাকার এই বুড়িগঙ্গার তীর মুখরিত হয়ে উঠবে হাজারো ক্রেতা-বিক্রেতার দরদামের কোলাহলে।

