রাজধানীর বুকে কোরবানির পশুর হাটের চেনা হাঁকডাক এখনো শুরু হয়নি। তবে এর মাঝেই ঢাকার অস্থায়ী হাটগুলোর চত্বরে জমতে শুরু করেছে পশুর বহর। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ঈদের মাত্র কয়েক দিন আগে হাট বসার কথা থাকলেও, জায়গা হারানোর শঙ্কায় আগেভাগেই পশু নিয়ে শহরে ঢুকছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বেপারি ও খামারিরা।
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অস্থায়ী পশুর হাটগুলোর শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। মূলত ঈদের দিনসহ মোট পাঁচ দিন এই নির্ধারিত অস্থায়ী হাটগুলোতে কোরবানির পশু কেনা-বেচার আইনি অনুমতি রয়েছে। তবে মাঠের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আইনি সময়সীমার তোয়াক্কা না করে অনেক ব্যবসায়ী ইতিমধ্যেই ঢাকার বিভিন্ন হাটে নিজেদের জায়গা দখলে নিয়েছেন। দূর-দূরান্ত থেকে আসা এসব খামারিদের ভয়, দেরিতে এলে হয়তো হাটের সুবিধাজনক স্থানে গরু রাখার মতো পর্যাপ্ত জায়গা তারা পাবেন না। আর এই আশঙ্কাই তাদের বাধ্য করেছে আগেভাগে রওনা দিতে।
আজ বুধবার (২০ মে) রাজধানীর অন্যতম বড় অস্থায়ী পশুর হাট কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের দক্ষিণ পাশে গিয়ে খামারিদের এই আগাম প্রস্তুতির দৃশ্য চোখে পড়ে। স্টেশন সংলগ্ন বিশাল খালি জায়গায় ইতিমধ্যেই সারি সারি গরু নিয়ে অবস্থান নিয়েছেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বেশ কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী।
সরেজমিনে দেখা যায়, কমলাপুরের এই অস্থায়ী পশুর হাটে এরইমধ্যে শতাধিক গরু এসে পৌঁছেছে। বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে অস্থায়ী ছাউনি তৈরির কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। তার মাঝেই খামারিরা নিজেদের পশুগুলোকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। ব্যস্ত সময় পার করছেন গরুর পরিচর্যা ও খাবার দেওয়ায়।
হাটের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, একেকজন খামারি বা বেপারি সর্বনিম্ন ১০টি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩০টি পর্যন্ত গরু নিয়ে হাটে এসেছেন। তবে একটি বিষয় বেশ কৌতূহল জাগিয়েছে। এখন পর্যন্ত এই কমলাপুর হাটে যারা আগাম এসেছেন, তাদের প্রায় সবাই কুষ্টিয়া জেলার খামারি।
কুষ্টিয়ার দেশি গরুর চাহিদা ঢাকায় বরাবরই অনেক বেশি। আর সেই সুযোগটি হাতছাড়া করতে চান না এই অঞ্চলের খামারিরা। তবে কমলাপুরের এই হাটে এখনো পর্যন্ত কোনো ছাগল, ভেড়া বা অন্য কোনো ধরনের কোরবানির পশু নিয়ে কাউকে অগ্রিম আসতে দেখা যায়নি। কেবল গরুর বেপারিরাই মাঠ দখল করে আছেন।
কুষ্টিয়া জেলা থেকে বড় গরুর বহর নিয়ে আসা ব্যবসায়ীদের মধ্যে অন্যতম মো. শামীম। হাটের এক কোণে নিজের গরুর তদারকি করার সময় এই প্রতিবেদকের সাথে তার কথা হয়। তিনি জানান, তাদের একটি বড় ব্যবসায়ী দল কুষ্টিয়া থেকে আনুমানিক ৩০০টি গরু নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল।
শামীম বলেন, “আমরা অনেক বড় দল। কুষ্টিয়া থেকে রওনা দিয়ে ঢাকায় আসার পর আমাদের পুরো টিমটি তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। ঢাকার তিনটি বড় বাজারে আমরা এই ৩০০টি গরু বিক্রির জন্য ভাগ করে নিয়েছি। আমাদের একটি দল গেছে উত্তরায়, একটি গাবতলীতে এবং আমরা এসেছি কমলাপুরে।”
একই জেলার দৌলতপুর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ গ্রাম থেকে নিজের খামারের ২০টি গরু নিয়ে এসেছেন মো. লোকমান মিয়া। ঢাকার হাটের চড়া রোদে গরুর গায়ে পানি ছেটাতে ছেটাতে তিনি এই প্রতিবেদককে মাঠের আসল সংকটের কথা জানান। তার চোখে-মুখে দীর্ঘ পথের ক্লান্তির পাশাপাশি ছিল এক ধরণের চাপা উদ্বেগ।
লোকমান মিয়া বলেন, “কমলাপুরের এই হাটে আমাদের এলাকার যে কয়জন খামারি এসেছেন, তাদের প্রত্যেকের কাছেই সর্বনিম্ন ১০টি থেকে শুরু করে ৩০টি পর্যন্ত গরু রয়েছে। আমাদের আনা সবগুলো গরুই সম্পূর্ণ দেশি এবং গৃহস্থালি জাতের। কোনো রাসায়নিক বা ক্ষতিকর ওষুধ ছাড়াই আমরা এগুলোকে বড় করেছি।”
এত দিন আগে হাটে আসার কারণ জানতে চাইলে লোকমান মিয়া সরাসরি বলেন, “ঢাকায় হাটের জায়গা নিয়ে মারামারি অবস্থা হয়। শেষ সময়ে এলে ভালো জায়গা পাওয়া যায় না। হাটে জায়গা না পাওয়ার একটা বড় ভয় আমাদের মনে সবসময় কাজ করে। সেই ভয়েই আমরা অনেক দিন আগেই চলে এসেছি।”
আগেভাগে আসার পেছনে কেবল জায়গার সংকটই একমাত্র কারণ নয়, এর পেছনে পরিবহন খাতের এক জটিল সমীকরণও কাজ করেছে। খামারিরা জানান, ট্রাক মালিকদের সঙ্গে পূর্ব চুক্তির কারণে এবং শেষ মুহূর্তের চড়া ভাড়া এড়াতে তাদের এই আগাম ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
ঈদের ঠিক চার-পাঁচ দিন আগে সারা দেশ থেকে ঢাকাভিমুখী পশুবাহী ট্রাকের ভাড়া আকাশচুম্বী হয়ে যায়। অনেক সময় দ্বিগুণ টাকা দিয়েও সঠিক সময়ে ট্রাক পাওয়া যায় না। এই পরিবহন বিপর্যয় এড়াতে খামারিরা ১০ দিন আগেই ট্রাক বুকিং করে ঢাকার দিকে রওনা দিতে বাধ্য হন।
তবে হাটে এত আগে আসলেও এখনো পর্যন্ত কোনো বেপারি একটি গরুও বিক্রি করতে পারেননি। কারণ ঢাকার স্থানীয় ক্রেতারা এখনো হাটে আসা শুরু করেননি। এখন যারা আসছেন, তারা মূলত হাট ঘুরে দেখছেন এবং গরুর সাইজ ও দামের একটি প্রাথমিক ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, তারা এখনই গরু বিক্রি করার জন্য তাড়াহুড়ো করছেন না। তাদের মূল লক্ষ্য আগামী শুক্রবার থেকে পুরোদমে বেচাকেনা শুরু করা। কারণ শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় ঢাকার চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ পরিবারসহ হাটে আসবেন এবং তখন থেকেই বাজার জমজমাট হবে বলে তারা আশা করছেন।
প্রসঙ্গের উল্লেখ্য, এবারের পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে রাজধানীতে মোট ২৬টি কোরবানির পশুর অস্থায়ী ও স্থায়ী হাট বসানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) অধীনে ১৩টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) অধীনে ১৩টি হাট বসবে।
দুই সিটি কর্পোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঈদুল আজহার ঘোষিত দিনসহ মোট পাঁচ দিন এসব হাটে আনুষ্ঠানিকভাবে পশু কেনা-বেচা করার নিয়ম কার্যকর থাকবে। এর আগে বা পরে হাটের ভেতরে কোনো ধরণের অননুমোদিত আর্থিক লেনদেন বা হাসিল আদায় করা আইনত দণ্ডনীয়।
তবে প্রতি বছরের মতো এবারও কর্তৃপক্ষের এই নির্দেশ কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে, ঈদের এখনো বেশ কয়েক দিন বাকি থাকলেও হাটগুলো ইতিমধ্যেই সচল হতে শুরু করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগাম আসা খামারিদের উচ্ছেদ বা বাধা দেওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।
নগর পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, এভাবে ঈদের ১০-১২ দিন আগে রাজধানীর প্রধান সড়ক ও স্টেশনের পাশে পশুর হাট জমে উঠলে শহরের স্বাভাবিক ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। বিশেষ করে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের মতো সংবেদনশীল এলাকায় পশুর এই আগাম উপস্থিতি ট্রেন যাত্রীদের চলাচলেও বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
তবে খামারিদের দাবি, তারা নিরুপায় হয়েই এই পথ বেছে নিয়েছেন। দূর দেশ থেকে লাখ লাখ টাকার পশু নিয়ে এসে যদি তারা হাটে দাঁড়ানোর জায়গা না পান, তবে তাদের পুরো বছরের খামারের খাটুনি এবং বিনিয়োগ মাটিতে মিশে যাবে। তাই তারা কিছুটা কষ্ট করে হলেও আগেভাগে আসাকেই নিরাপদ মনে করছেন।
কমলাপুর পশুর হাটের ইজারাদার পক্ষের এক প্রতিনিধি জানান, খামারিরা স্বেচ্ছায় আগে চলে এসেছেন। আমরা তাদের জন্য বাঁশ ও খুঁটি গাড়ার কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছি। তারা আমাদের মেহমান, তাই দূর থেকে আসা এই মানুষদের আমরা তাড়িয়ে দিতে পারি না। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও আমরা দেখছি।
বর্তমানে ঢাকার আবহাওয়া কিছুটা উত্তপ্ত ও ভ্যাপসা গরম। এই প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে এত দিন আগে হাটে আসা গরুর স্বাস্থ্য নিয়ে কিছুটা চিন্তিত খামারিরা। দীর্ঘ সময় হাটের ধুলোবালি ও খোলা আকাশের নিচে থাকলে গরুর ওজন কমে যাওয়ার বা রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
কুষ্টিয়ার বেপারিরা জানান, তারা গরুর স্বাস্থ্যের দিকে সার্বক্ষণিক নজর রাখছেন। নিয়মিত খড়, ভুসি ও বিশুদ্ধ পানি খাওয়াচ্ছেন। ঢাকার স্থানীয় পশু চিকিৎসকদের সাথেও তারা যোগাযোগ রাখছেন, যেন কোনো গরু অসুস্থ হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
কোরবানির পশুর এই আগাম আগমনী বার্তা মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ঈদ আর বেশি দূরে নেই। আগামী দিনগুলোতে কুষ্টিয়া ছাড়াও পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী এবং চিলমারী অঞ্চল থেকে আরও হাজার হাজার পশুবাহী ট্রাক ঢাকায় প্রবেশ করবে। তখন ঢাকার এই অস্থায়ী হাটগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করবে।
আপাতত কমলাপুর হাটের এই আগাম গরুর বহর দেখতে স্থানীয় শিশু ও কিশোরদের ভিড় জমতে শুরু করেছে। ঢাকা শহরের নাগরিক ব্যস্ততার মাঝে পশুর হাটের এই আগাম আমেজ এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী শুক্রবার থেকে খামারিদের প্রত্যাশা অনুযায়ী বেচাকেনা শুরু হয় কি না।

