দেশের বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ অভিভাবক সুপ্রিম কোর্ট। সেই সর্বোচ্চ আদালতের নিজস্ব প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং কাঠামোর ওপর এক বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করার সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এখন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের আইনি অঙ্গন।
হঠাৎ করেই এই বিশেষ সচিবালয়টি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সেখানকার কর্মরত কর্মকর্তাদের রাতারাতি বদলি করে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। সরকারের এমন আকস্মিক ও নজিরবিহীন পদক্ষেপকে ‘গুরুতর আদালত অবমাননা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন দেশের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা।
আজ বুধবার (২০ মে) সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে এই কড়া প্রতিক্রিয়া জানান জ্যেষ্ঠ আইনি বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শিশির মনির। সরকারের এই সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর এক ধরণের হস্তক্ষেপ বলে মনে করছেন অনেকে।
সচিবালয় বিলুপ্তির এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আইনজীবী শিশির মনির স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা খুব দ্রুতই আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন করার প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে।
গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে শিশির মনির বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার আলোকেই এই বিশেষ সচিবালয়টি গঠন করা হয়েছিল। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই পুরো প্রক্রিয়াটি এবং এর বৈধতা সংক্রান্ত একটি মামলা এখনো আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “একটি বিষয় যখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকে, তখন সেই কাঠামো ভেঙে দেওয়া আইনত দণ্ডনীয়। চলমান মামলার মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করা এবং কর্মকর্তাদের সরিয়ে নেওয়া সরাসরি এবং অত্যন্ত গুরুতর আদালত অবমাননা।”
আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, “আমরা এই বেআইনি পদক্ষেপকে এভাবে ছেড়ে দিতে পারি না। দেশের বিচার ব্যবস্থার মর্যাদা রক্ষায় আমরা আগামীকালই (বৃহস্পতিবার) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করব।”
এর আগে গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সরকারের পক্ষ থেকে একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক রদবদলের আদেশ আসে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় পুরোপুরি বিলুপ্ত করে সেখানকার সিনিয়র সচিবসহ মোট ১৫ জন জুডিসিয়াল কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত নেওয়া হয়।
আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এই সংক্রান্ত একটি বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে দাবি করা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সমন্বয়ের মাধ্যমেই সরকার এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ অনুযায়ী জুডিসিয়াল সার্ভিসের এই সদস্যদের পরবর্তী উপযুক্ত পদে পদায়নের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সেই উদ্দেশ্যে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাদের আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত করা হলো।
প্রজ্ঞাপনে একটি ছকের মাধ্যমে বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে তাদের সাবেক পদ এবং আইন মন্ত্রণালয়ে তাদের বর্তমান সংযুক্ত পদের কথা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
হঠাৎ করে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক কাজে এক ধরণের স্থবিরতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সাধারণ আইনজীবীরা। কারণ একটি সুসংগঠিত সচিবালয় হঠাৎ বিলুপ্ত হলে পুরো ব্যবস্থাপনাই ভেঙে পড়ে।
এই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়। গত বছরের অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর অত্যন্ত জমকালো এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই সচিবালয়ের আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবন-৪ এ এই নতুন সচিবালয়টির কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল। বিচার বিভাগের নিজস্ব প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই পদক্ষেপটিকে তখন একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগের শীর্ষ কর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তৎকালীন প্রধান বিচারপতির পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলও সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের যাত্রাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
উদ্বোধনের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়ায় আইনি মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সরকারের এই ইউ-টার্ন বা সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের নেপথ্যে কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব রয়েছে কি না, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
সুপ্রিম কোর্টের সাধারণ আইনজীবীদের একাংশ বলছেন, বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখার যে দীর্ঘদিনের লড়াই, এই সিদ্ধান্তের ফলে তা অনেকটাই পিছিয়ে গেল। কর্মকর্তাদের আবার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরিয়ে নেওয়া স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার পরিপন্থী।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাসদার হোসেন মামলার ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ছিল তারই একটি বাস্তব রূপ। এটি বিলুপ্ত করার অর্থ হলো বিচার বিভাগের ওপর মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
তবে সরকারের একটি সূত্র দাবি করেছে, প্রশাসনিক কাজের সমন্বয়হীনতা দূর করতে এবং জুডিসিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সঠিক মূল্যায়নের স্বার্থেই এই রদবদল করা হয়েছে। এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কোনো হানি হবে না বলে দাবি তাদের।
আজ হাইকোর্ট চত্বরে সাধারণ আইনজীবীদের মধ্যেও এই বিষয়টি নিয়ে তুমুল আলোচনা ও বিতর্ক চলতে দেখা যায়। অনেক আইনজীবী বলছেন, আদালত অবমাননার মামলাটি দায়ের হলে সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়ে কী পর্যবেক্ষণ দেয়, সেটিই হবে এখন দেখার বিষয়।
যদি আদালত এই বিলুপ্তির আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করে, তবে সরকারের জন্য এটি বড় ধরণের আইনি বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করবে। অন্যদিকে, সরকার যদি আদালতের পরামর্শের প্রমাণাদি সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারে, তবে মামলার মোড় ভিন্ন দিকে ঘুরবে।
বিকালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির কয়েকজন নেতা অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে বসেন। তারা মনে করছেন, বিচার বিভাগের যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বার এবং বেঞ্চের মধ্যে আরও আলোচনা হওয়া উচিত ছিল। এভাবে আকস্মিক প্রজ্ঞাপন জারি করা কাম্য নয়।
আইনজীবী মুহাম্মদ শিশির মনিরের এই ঘোষণা ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে এক ধরণের আশার আলো তৈরি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে হয়তো এই সচিবালয় আবার সচল করা সম্ভব হতে পারে।
এদিকে আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বদলি হওয়া ১৫ জন কর্মকর্তাকে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উইংয়ে দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আজ সকাল থেকেই বিলুপ্ত সচিবালয়ের কর্মকর্তারা তাদের নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে শুরু করেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক জুনিয়র আইনজীবী বলেন, “আমরা চাই বিচার বিভাগ তার নিজস্ব শক্তিতে চলুক। সচিবালয় বিলুপ্তির এই ঘটনাটি আমাদের সাধারণ আইনজীবীদের মনে এক ধরণের অস্বস্তি তৈরি করেছে।”
আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকালে যখন আদালত অবমাননার আবেদনটি করা হবে, তখন সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ এটি শুনানির জন্য গ্রহণ করে কি না, তার ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া। আদালত এই বিষয়ে জরুরি রুল জারি করতে পারে বলেও গুঞ্জন রয়েছে।
সারা দেশের নিম্ন আদালত এবং উচ্চ আদালতের প্রশাসনিক কাজের তদারকি করার জন্য একটি শক্তিশালী স্বাধীন সচিবালয় অপরিহার্য বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও আইন বিশ্লেষকরা। মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরশীলতা বিচারকদের কাজের গতি কমিয়ে দিতে পারে।
মুহাম্মদ শিশির মনির আরও বলেন, “বিচার বিভাগের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সংবিধান প্রদত্ত। কোনো নির্বাহী আদেশ দিয়ে আদালতের নির্দেশনাকে খর্ব করা যায় না। আমরা আদালতের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছি এবং আশা করছি ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।”
আজকের এই পুরো ঘটনার পর সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিছুটা জোরদার করা হয়েছে। সাংবাদিকদের ভিড় এবং আইনজীবীদের ক্ষোভ প্রকাশকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরণের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সতর্ক রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সব মিলিয়ে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তির এই ঘটনাটি কেবল একটি প্রশাসনিক বদলি নয়, বরং এটি বাংলাদেশের বিচার বিভাগ বনাম নির্বাহী বিভাগের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের নতুন এক অধ্যায় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আদালতের আগামীকালের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে এই লড়াইয়ের ভবিষ্যৎ।

