দেশজুড়ে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না হামের ভয়াবহ প্রকোপ। চেনা এই সংক্রামক ব্যাধিটি এবার রীতিমতো রুক্ষ রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে। একের পর এক শিশুর প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে এই রোগ। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম এবং এর তীব্র উপসর্গ নিয়ে আরও ১১টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (১৯ মে) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষ সেল থেকে পাঠানো সর্বশেষ নিয়মিত প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন করে মারা যাওয়া এই শিশুদের মধ্যে ২ জনের শরীরে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল।
বাকি ৯ জন শিশুর শরীরে হামের শতভাগ উপসর্গ বা লক্ষণ ছিল। হাসপাতালের বিছানায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা মারা যায়। এই হিসাবটি গতকাল সোমবার (১৮ ১৮ মে) সকাল ৮টা থেকে আজ মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টার মাঠ পর্যায় থেকে আসা তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
একই সময়ের মধ্যে সারা দেশে নতুন করে আরও ১ হাজার ৩৩৭ জন শিশু এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। আচমকা আক্রান্তের এই উল্লম্ফন হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ডের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। রাজধানীসহ জেলা শহরের হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই।
চিকিৎসকেরা বলছেন, এবারের হামের রূপটি বেশ জটিল। সাধারণত হামের পর শিশুরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠলেও এবার অনেকের ক্ষেত্রেই তা নিউমোনিয়া বা তীব্র শ্বাসকষ্টে রূপ নিচ্ছে। আর এই জটিলতার কারণেই মৃত্যুর মিছিল কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া দীর্ঘমেয়াদী পরিসংখ্যানটি আরও বেশি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে সারা দেশে হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে সবমিলিয়ে ৪৭৫ জন শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে।
এই বিপুল সংখ্যক মৃত্যুর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামের কারণে মারা গেছে ৭৭ জন শিশু। বাকি ৩৯৮ জন শিশু মারা গেছে হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিশু হাসপাতালে আসার আগেই বা ল্যাব পরীক্ষার সুযোগ পাওয়ার আগেই মারা গেছে।
গত দুই মাসের সামগ্রিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত বা পরীক্ষায় প্রমাণিত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৯২৯ জনে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে আরও ৫৬ হাজার ৮৮৬ জন শিশু।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত ও উপসর্গের এই সংখ্যাটি কেবল সরকারি খাতায় নথিভুক্ত হওয়া চিত্র। এর বাইরেও দেশের বহু প্রত্যন্ত গ্রামে ল্যাব পরীক্ষা ছাড়া কিংবা স্থানীয় কবিরাজ ও ফার্মেসির ওষুধ খেয়ে ঘরে থাকা হাজারো আক্রান্ত শিশু এই হিসাবের বাইরেই থেকে গেছে।
ভৌগোলিক দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, এবার হামের এই মরণকামড় সবচেয়ে বেশি পড়েছে ঢাকা বিভাগে। জনঘনত্ব এবং অসচেতনতার কারণে এই বিভাগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার দেশের অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
সরকারি হিসাব মতে, কেবল ঢাকা বিভাগেই গত দুই মাসে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ২০৫ জন শিশু। একই সময়ে এই একটি বিভাগেই আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৯২৯ জনে। অর্থাৎ, দেশের মোট আক্রান্তের অর্ধেকেরও বেশি কেবল ঢাকা বিভাগেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানিয়েছে, এই সামগ্রিক হিসাবটি গত ১৫ মার্চ সকাল ৮টা থেকে শুরু করে আজ ১৯ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ের। দুই মাসের এই সংক্ষিপ্ত সময়ে একটি নির্দিষ্ট রোগে এত শিশুর মৃত্যু জনস্বাস্থ্য খাতকে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন শিশু হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে এক করুণ দৃশ্য। মায়েরা তাদের আক্রান্ত সন্তানদের কোলে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন একটি আইসোলেশন শয্যার আশায়। সংক্রামক ব্যাধি হওয়ায় সাধারণ ওয়ার্ডে এদের রাখা যাচ্ছে না।
গুলিস্তানের বাসিন্দা এক মা তার চার বছরের সন্তানকে নিয়ে এসেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তিনি জানান, প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে করে পাড়ার দোকান থেকে নাপা খাইয়েছিলেন। তিন দিন পর সারা শরীরে লালচে দানা ওঠার পর বুঝতে পারেন এটি হাম।
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের এক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের এখানে প্রতিদিন যত রোগী আসছে, তাদের সবাইকে ভর্তি করার মতো জায়গা আমাদের নেই। অনেক শিশুকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দিতে হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “মাঠ পর্যায়ে টিকাদানের যে লক্ষ্যমাত্রা থাকে, সেখানে হয়তো কোনো বড় ধরনের ঘাটতি থেকে গেছে। কোনো নির্দিষ্ট এলাকার শিশুরা যদি নিয়মিত টিকা থেকে বাদ পড়ে, তবে কয়েক বছর পর সেখানে এমন মহামারি দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতির জন্য টিকাদান কর্মসূচির নিয়মিত তদারকির অভাবকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, করোনা পরবর্তী সময়ে দেশের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে এক ধরণের শিথিলতা তৈরি হয়েছিল। তারই খেসারত দিতে হচ্ছে এখনকার শিশুদের।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, হাম পুরোপুরি নির্মূল করতে হলে দেশের অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে এই রোগের প্রতিষেধক টিকার আওতায় আনতে হয়। বাংলাদেশে এই হার কাগজে-কলমে ভালো হলেও বাস্তব চিত্র যে ভিন্ন, তা এই মৃত্যুই প্রমাণ করে।
আজ দুপুরের দিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এক জরুরি বৈঠকে দেশের সব সিভিল সার্জনদের নিজ নিজ এলাকার টিকাদান কেন্দ্রগুলো পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। যেসব এলাকায় আক্রান্তের হার বেশি, সেখানে বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালুর কথা ভাবা হচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলে এখনো হাম নিয়ে নানা ধরনের কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। অনেক পরিবার মনে করে, হাম হলে শিশুকে ঘর থেকে বের করা যাবে না বা ডাক্তার দেখানো যাবে না। কেবল নিমপাতা আর জলপড়া দিয়েই এই রোগ ভালো করার চেষ্টা করেন অনেকে।
এই সামাজিক অনগ্রসরতার কারণে গ্রামীণ এলাকায় মৃত্যুর হার বেশি হচ্ছে বলে মনে করছেন মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা। তারা বলছেন, সঠিক সময়ে শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে এলে এবং পুষ্টিকর খাবার ও ওআরএস খাওয়ালে এই মৃত্যু অনায়াসে ঠেকানো সম্ভব।
ঢাকার বাইরে বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের পাহাড়ি অঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলের চরাঞ্চলগুলোতেও হামের প্রকোপ ছড়াচ্ছে। সেসব এলাকার যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় আক্রান্ত শিশুরা সময়মতো জরুরি চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, দেশে হামের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক এবং ভিটামিন-এ ক্যাপসুলের কোনো ঘাটতি নেই। তবে জেলা হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন ওয়ার্ডের সীমাবদ্ধতার কারণে চিকিৎসা দিতে বেগ পেতে হচ্ছে।
এদিকে, আজকের এই রিপোর্টের পর দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ ও শিশু অধিকার সংগঠনগুলো সরকারের টিকাদান কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন এত শিশু টিকার বাইরে থাকল, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি এখনো তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং একে ‘মহামারি’ বলার মতো সময় আসেনি। তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র এবং প্রতিদিনের মৃত্যুর সংখ্যা সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি করেছে।
আজ বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, “আমরা প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। আক্রান্তের হার কমাতে আমরা নতুন করে স্কুলভিত্তিক টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করার পরিকল্পনা করছি।”
আগামী দিনগুলোতে বর্ষা মৌসুম শুরু হলে এই ধরনের সংক্রামক রোগের প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই এখনই যদি যুদ্ধের গতিতে এই ভাইরাসের বিস্তার রোধ করা না যায়, তবে সামনের দিনগুলোতে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
আপাতত সরকারের সবকটি স্বাস্থ্য ইউনিটকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। তবে শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, নিজের সন্তানকে সুরক্ষিত রাখতে বাবা-মায়েদেরও সচেতন হতে হবে এবং লক্ষ্মণ দেখামাত্রই নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে।

