দুর্যোগ আর দুর্ঘটনার মুহূর্তে যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে মানুষের পাশে দাঁড়ান, সেই ফায়ার ফাইটারদের হাতকে আরও শক্তিশালী করতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সামগ্রিক সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে এখন একাধিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
আজ মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে ‘ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহ-২০২৬’ এর পাসিং আউট প্যারেড ও পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন এবং জনবল বৃদ্ধিই এখন সরকারের মূল লক্ষ্য।
রাজধানীর উপকণ্ঠে আয়োজিত এই চোখধাঁধানো কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সারা দেশে নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণ, দ্রুতগতির অত্যাধুনিক অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহ এবং ডুবুরি ইউনিট সম্প্রসারণের কাজ পুরোদমে চলছে। একই সঙ্গে কর্মীদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। এ সময় নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপুসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, ঘনঘন অগ্নিকাণ্ড, জটিল সড়ক দুর্ঘটনা, বন্যা এবং বহুতল ভবনধসের মতো ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়েছে। এই ধরনের বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিসের মতো দক্ষ বাহিনীর গুরুত্ব এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে ফায়ার সার্ভিসকে একটি পরম সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যেকোনো দুর্যোগে এই বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের জীবনের তোয়াক্কা না করে মানুষের জানমাল রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। আর এই কারণেই দেশের সাধারণ মানুষের কাছে তারা এখন গভীর নির্ভরতার প্রতীক।
বর্তমানে সারা দেশে ৫৩৮টি ফায়ার স্টেশনের মাধ্যমে জরুরি সেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে দেশের বিশাল জনসংখ্যা ও ক্রমবর্ধমান নগরায়ণের তুলনায় এই সংখ্যাটি পর্যাপ্ত নয় বলে স্বীকার করেছে প্রশাসন। এই ঘাটতি মেটাতে বর্তমানে আরও ২০টি নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।
জরুরি চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ফায়ার সার্ভিসের অ্যাম্বুলেন্স বহরকে আরও বড় করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে নতুন করে আরও ১০০টি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌ-দুর্ঘটনা কিংবা পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনায় উদ্ধারকাজ আরও বেগবান করতে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ডুবুরিদের কর্মদক্ষতা ও সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়াতে সম্প্রতি এই ইউনিটে ৭২টি নতুন পদ সৃষ্টির সরকারি প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের পুরো সাংগঠনিক কাঠামো বা অর্গানোগ্রাম পুনর্গঠন করার একটি বড় পরিকল্পনাও এখন সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে এই বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশিতে উন্নীত করার একটি রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে।
প্রশাসনিক কাজের গতি বাড়াতে এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে ডিজিটালাইজেশনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সেবা সহজ করা, শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত ১ মে থেকে দেশব্যাপী অনলাইনভিত্তিক ‘ই-ফায়ার লাইসেন্স’ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
এর ফলে এখন আর লাইসেন্স পাওয়ার জন্য কোনো ব্যবসায়ী বা ভবন মালিককে দিনের পর দিন ফায়ার সার্ভিসের অফিসে ঘুরতে হবে না। ঘরে বসেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে খুব সহজে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে বৈধ লাইসেন্স ও নবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
কাজের সুবিধার পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আবাসন সংকট দূর করতেও আবাসন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। ঢাকার মিরপুর ও সদরঘাট এলাকায় ফায়ার ফাইটারদের জন্য বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের কাজ এখন চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে মিরপুরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত নতুন সদর দফতর ভবন তৈরি হচ্ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ কাজের কথা বিবেচনা করে বাহিনীর সদস্যদের আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর বিষয়টিও সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ফায়ার ফাইটারদের জন্য বিশেষ ‘ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ ভাতা’ এবং ‘ফ্রেশ মানি’ দেওয়ার বিষয়টি বর্তমানে গভীরভাবে পরীক্ষা-নীলিক্ষা ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বক্তব্যের একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকাজে গিয়ে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করা শহীদ ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। দেশের মানুষের জীবন বাঁচাতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে এই গৌরবময় বাহিনীর মোট ৫২ জন অকুতোভয় সদস্য কর্তব্যরত অবস্থায় মারা গেছেন।
অনুষ্ঠানে ফায়ার সার্ভিসের গত বছরের আভিযানিক সফলতার একটি খতিয়ান তুলে ধরা হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ফায়ার সার্ভিস দেশজুড়ে মোট ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ড সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। ফায়ার ফাইটারদের সময়োচিত পদক্ষেপের কারণে প্রায় ৩ হাজার ২৬৩ কোটি টাকার সম্পদ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।
একই সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া ৭ হাজার ৮১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় উদ্ধার অভিযান চালিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। এসব দুর্ঘটনা থেকে আহত অবস্থায় ৯ হাজার ২৬৬ জন এবং নিহত ১০৩৮ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছেন এই বাহিনীর কর্মীরা। উদ্ধারকাজে তাদের ভূমিকা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।
কেবল দুর্ঘটনাকবলিত স্থানে উদ্ধারকাজই নয়, দুর্যোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধিতেও কাজ করছে এই প্রতিষ্ঠান। গত এক বছরে প্রায় ১৫ হাজার গণসংযোগ কার্যক্রম এবং ১০ হাজারের বেশি বহুতল ভবন পরিদর্শন করা হয়েছে। এছাড়া আড়াই লাখের বেশি সাধারণ মানুষকে অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
আজকের এই জাঁকজমকপূর্ণ পাসিং আউট প্যারেডে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট ২৩৪ জন নতুন সদস্য অংশ নেন। এর মধ্যে স্টেশন অফিসার ও স্টাফ অফিসার ক্যাটাগরিতে ১২ জন, ফায়ার ফাইটার ক্যাটাগরিতে ১৫৮ জন, নার্সিং অ্যাটেনডেন্ট ক্যাটাগরিতে ২ জন, ড্রাইভার ক্যাটাগরিতে ৫৬ জন এবং ডুবুরি ক্যাটাগরিতে ৬ জন নতুন কর্মী তাদের প্রশিক্ষণ শেষ করলেন।
প্যারেড পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ফায়ার সার্ভিসের ৮৪ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর হাতে বিশেষ রাষ্ট্রীয় পদক তুলে দেন। নিজেদের কর্মক্ষেত্রে বহুমাত্রিক বীরত্বপূর্ণ অবদান, সাহসিকতা এবং সততার স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের এই সম্মাননা দেওয়া হলো।
পদকপ্রাপ্তদের এই তালিকায় ২০২৩ সালের সাহসিকতার জন্য ৩৪ জন এবং ২০২৪ সালের বিভিন্ন উদ্ধারকাজে অনন্য অবদানের জন্য ৫০ জন সদস্যকে পুরস্কৃত করা হয়। পদকপ্রাপ্তদের মধ্যে কয়েকজন নিহত ফায়ার ফাইটারের পরিবারও উপস্থিত ছিলেন, যাদের মরণোত্তর পদক দেওয়া হয়।
পুরস্কার বিতরণী শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নতুন ফায়ার ফাইটারদের উদ্দেশে বলেন, “আজ থেকে আপনারা দেশের মানুষের জানমালের পাহারাদার। যেকোনো বিপদে সাধারণ মানুষ সবার আগে আপনাদের কথা মনে করে। পেশাগত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই বিশ্বাসের মর্যাদা ধরে রাখতে হবে।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ফায়ার সার্ভিসের এই আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া কেবল ঢাকা কেন্দ্রিক নয়, বরং দেশের প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। দেশের প্রতিটি প্রান্তে যেন ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছাতে পারে, সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে ফায়ার সার্ভিসকে উন্নত করতে হলে কেবল জনবল বাড়ালেই হবে না, বরং বহুতল ভবনের আগুন নেভানোর জন্য ল্যাডার বা আধুনিক মই এবং কেমিক্যাল আগুন নেভানোর জন্য বিশেষায়িত ফোম টেন্ডারের সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে।
আজকের এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো বলে মনে করছেন বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তারা। আধুনিক সরঞ্জাম, বর্ধিত জনবল এবং উন্নত আবাসন সুবিধা নিশ্চিত হলে মাঠ পর্যায়ের ফায়ার ফাইটারদের কাজের উদ্দীপনা আরও অনেক বেড়ে যাবে।

