সারা দেশে হঠাৎ করেই আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হাম ও সন্দেহজনক হাম রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড বা কেবিন চালু করা এখন থেকে বাধ্যতামূলক।
আজ মঙ্গলবার (১৯ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এই সংক্রান্ত একটি জরুরি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং আক্রান্তদের সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতেই মূলত এই কড়া অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন। অধিদপ্তর থেকে মোট পাঁচ দফার একটি বিশেষ নির্দেশনাবলী দেশের সব হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক মঈনুল আহসান এই নির্দেশনায় স্বাক্ষর করেছেন। চিঠিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো হাসপাতালই এখন থেকে হামের লক্ষণ থাকা রোগীদের ফিরিয়ে দিতে পারবে না। সরকারি প্রতিটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করতে হবে।
চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। সাধারণ ওয়ার্ডে এই রোগীকে রাখলে অন্য রোগীদের মধ্যে তা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগের জটিলতা অনেক বেশি দেখা দেয়। আর এই কারণেই আইসোলেশন ওয়ার্ডের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।
নতুন এই নির্দেশনায় কেবল আলাদা ওয়ার্ড তৈরি করেই ক্ষান্ত থাকতে বলেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেখানে বলা হয়েছে, প্রতিটি হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ চিকিৎসক ও দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রাখতে হবে। জনবলের অভাবে যেন কোনো রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে চিকিৎসকদের দায়িত্ব পালনে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি ছুটির দিনগুলোতেও হাসপাতালে চিকিৎসার স্বাভাবিক গতি বজায় রাখতে হবে। প্রতিদিন সকাল ও বিকেল—দুই বেলা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বাধ্যতামূলকভাবে এই আইসোলেশন ওয়ার্ডগুলো রাউন্ড দিতে হবে এবং রোগীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
হাসপাতালে সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে আরও একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এখন থেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কোনো হাম রোগীর সঙ্গে একজনের বেশি অভিভাবক বা দর্শনার্থী অবস্থান করতে পারবেন না। অতিরিক্ত মানুষের আনাগোনা রোগের সংক্রমণকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাশাপাশি, পুরো দেশের বাস্তব চিত্র যেন সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে, সেজন্য তথ্যের আদান-প্রদান আরও আধুনিক করা হচ্ছে। হাসপাতালে প্রতিদিন কতজন নতুন হাম রোগী ভর্তি হচ্ছেন এবং কতজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন, সেই সমস্ত তথ্য প্রতিদিনের ভিত্তিতে এমআইএস সার্ভারে আপলোড করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার কয়েকটি বড় হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহে শিশু ওয়ার্ডগুলোতে জ্বরের পাশাপাশি শরীরে গুটি বা র্যাশ নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, এদের মধ্যে একটি বড় অংশই হামে আক্রান্ত। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে এটি মারাত্মক রূপ নিতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী বলে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তারা মনে করেন, কেবল কাগজে-কলমে নির্দেশনা জারি করলেই হবে না। প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতালগুলো এই নির্দেশনা কতটা মেনে চলছে, তা কঠোরভাবে নজরদারি করা প্রয়োজন। কারণ গ্রামীণ এলাকায় সচেতনতার অভাব বেশি।
সাধারণত বছরের এই সময়ে আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে সংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ কিছুটা বাড়ে। তবে এবার হামের এই আকস্মিক বৃদ্ধি খোদ স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদেরও চিন্তায় ফেলেছে। শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি পূর্ণাঙ্গভাবে সফল না হওয়া কিংবা কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় টিকাদানের হার কম থাকাকে এর কারণ হিসেবে ভাবা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, মাঠ পর্যায় থেকে আসা তথ্যে দেখা যাচ্ছে, কিছু কিছু পকেটে বা নির্দিষ্ট এলাকায় হামের সংক্রমণ বেশি। সেই জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নতুন নির্দেশনার ফলে বেসরকারি হাসপাতালগুলোও এখন এই চিকিৎসার দায় এড়াতে পারবে না।
বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোতে অনেক সময় সংক্রামক ব্যাধির রোগীকে ভর্তি নিতে অনীহা দেখা যায়। তবে আজকের নির্দেশনার পর বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ওপরও সমান দায় বর্তাবে। তাদেরও নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আলাদা কেবিন বা ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করে হামের রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
চিকিৎসকেরা অভিভাবকদের সতর্ক করে বলছেন, শিশুর তীব্র জ্বর, চোখ লাল হওয়া, সর্দি-কাশি এবং সারা শরীরে লালচে দানা দেখা দিলে অবহেলা করা যাবে না। এটিকে সাধারণ অ্যালার্জি বা সাধারণ জ্বর ভেবে ঘরে বসিয়ে রাখলে শিশুর নিউমোনিয়া বা অন্য কোনো জটিল উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে ইতিমধ্যেই এই নির্দেশনার কপি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সিভিল সার্জনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা নিজ নিজ এলাকার হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি আজ বিকেলের মধ্যেই যাচাই করে দেখেন। প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের সার্বভৌম স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে এবং যেকোনো ধরনের মহামারি পরিস্থিতি রুখতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতেও নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আপাতত দেশের বড় বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন ওয়ার্ড চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। তবে রাজধানীর বাইরের জেলা হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট থাকায় এই নির্দেশনা শতভাগ বাস্তবায়ন করা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, হাম নির্মূল করতে হলে টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের ওপরে রাখতে হয়। বাংলাদেশে এই হার বেশ ভালো হলেও কিছু ভাসমান জনগোষ্ঠী এবং দুর্গম এলাকার শিশুরা টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়। এবার সেই ফাঁকফোকরগুলোও খতিয়ে দেখছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
বিকেলের দিকে এক ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, বর্তমান পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি। তবে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবেই এই পাঁচ দফা নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। জনগণের সহযোগিতা এবং সচেতনতাই এই রোগ ছড়ানো বন্ধ করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।
হাসপাতালগুলোতে যেন তদারকি জোরদার থাকে, সেজন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষ টিম আকস্মিক পরিদর্শনে বের হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের অবহেলার কারণে সংক্রমণ ছড়ালে বা রোগীর ক্ষতি হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আজ স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

