রাজধানী ঢাকার সাধারণ মানুষের চলাচলের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ফুটপাত। বছরের পর বছর ধরে এই ফুটপাত দখল এবং হকার উচ্ছেদ নিয়ে চলছে নানা টানাপোড়েন। এবার এই বহু বছরের পুরনো ও জটিল সংকটে যুক্ত হলো নতুন এক আইনি মোড়।
ঢাকার রাস্তা এবং ফুটপাতে হকারদের বসার জন্য জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছেন উচ্চ আদালত। এই ধরনের বরাদ্দ দেওয়া কেন সম্পূর্ণ বেআইনি এবং অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, সরকারের কাছে তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
আজ মঙ্গলবার (১৯ মে) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশ দেন। আদালতের এই পদক্ষেপের ফলে ঢাকার ফুটপাত ব্যবস্থাপনা এবং নগরবাসীর চলাচলের অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আদালতের এই রুলের জবাব দেওয়ার জন্য সরকারের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় সরকার সচিব, আইন সচিব এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তারা।
কিছুদিন আগেই ঢাকা সিটি কর্পোরেশন প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছিল। ‘ঢাকার হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬’ নামের এই বিশেষ নীতিমালায় হকারদের নির্দিষ্ট কিছু শর্তে ফুটপাতে বসার অনুমতি দেওয়ার কথা বলা হয়।
কিন্তু প্রশাসনের এই নতুন নীতিমালাকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শোয়েবুজ্জামান। তিনি এই নীতিমালার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন।
আজ সেই রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত এই রুল জারি করেন। রিট আবেদনকারীর পক্ষের আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দেখান যে, ফুটপাত তৈরি করা হয়েছে সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্নে হেঁটে চলাচলের জন্য।
আইনজীবীদের মতে, জনসাধারণের চলাচলের পথ আটকে কোনো ধরনের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের জন্য জায়গা বরাদ্দ দেওয়া দেশের প্রচলিত আইনের পরিপন্থী। এটি সরাসরি নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করার শামিল।
ঢাকা শহরের কোটি মানুষের জন্য ফুটপাত একটি অতি প্রয়োজনীয় অংশ। হকারদের দখলে থাকার কারণে প্রতিনিয়ত পথচারীদের মূল রাস্তায় নেমে হাঁটতে হয়। এতে বাড়ছে দুর্ঘটনা এবং তৈরি হচ্ছে তীব্র যানজট।
বহু বছর ধরেই ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন ফুটপাত মুক্ত করার জন্য একের পর এক অভিযান চালিয়ে আসছে। কিন্তু উচ্ছেদের পরদিনই আবার ফুটপাত চলে যায় হকারদের দখলে। এই চক্র যেন কখনোই ভাঙছিল না।
এই বাস্তবতায় হকারদের একটি নিয়মের মধ্যে আনতে এবং পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে ‘হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬’ তৈরি করেছিল কর্তৃপক্ষ। এর উদ্দেশ্য ছিল নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্দিষ্ট স্থানে হকারদের ব্যবসা করার লাইসেন্স দেওয়া।
তবে এই নীতিমালার বিপক্ষে থাকা নাগরিকদের একাংশের দাবি, হকারদের বসার বৈধতা দিলে ঢাকার ফুটপাত চিরতরে হাতছাড়া হয়ে যাবে। সাধারণ মানুষের হেঁটে চলার আর কোনো জায়গাই অবশিষ্ট থাকবে না।
আদালতের আজকের এই আদেশের পর হকারদের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ঢাকার রাস্তায় ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন এমন লাখো মানুষের জীবনযাত্রায় এই আদেশের বড় প্রভাব পড়তে পারে।
হকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে অবশ্য বরাবরই দাবি করা হচ্ছে, বিকল্প স্থায়ী পুনর্বাসন না করে তাদের তাড়িয়ে দিলে তারা সপরিবারে না খেয়ে মরবেন। তারা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ফুটপাতে ব্যবসা করার অধিকার চান।
অন্যদিকে নগর পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, একটি আধুনিক ও সচল মেগাসিটির ফুটপাত কখনোই হকারদের ব্যবসার জায়গা হতে পারে না। পথচারীদের অধিকার সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে।
উচ্চ আদালতের এই রুল জারির ফলে এখন সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে, ফুটপাতে হকারদের জায়গা দেওয়ার সিদ্ধান্তটি আইনগতভাবে কীভাবে বৈধ। এর জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যাখ্যা দিতে হবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মামলার চূড়ান্ত রায়ের ওপর নির্ভর করছে ঢাকার ফুটপাতের ভবিষ্যৎ চেহারা কেমন হবে। এটি কি পথচারীদের দখলে থাকবে, নাকি হকারদের নিয়ন্ত্রণে যাবে, তা ঠিক করবে আদালত।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা যেমন গুলিস্তান, মতিঝিল, নিউমার্কেট, মিরপুর এবং ফার্মগেটে ফুটপাত বলতে এখন আর কিছু অবশিষ্ট নেই। পুরো জায়গা জুড়েই বসেছে চৌকি, ভ্যান গাড়ি আর কাপড়ের দোকান।
সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়ক দিয়ে বাস ও গাড়ির পাশ ঘেঁষে হাঁটতে হয়। প্রতিদিনের এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে নাগরিক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে একটি স্থায়ী আইনি সমাধানের দাবি জানিয়ে আসছিল।
আজকের হাইকোর্টের এই রুলকে সেই দীর্ঘদিনের নাগরিক আন্দোলনের একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন অনেকে। রিটকারী আইনজীবী জানান, তারা চান ঢাকার মানুষ যেন স্বাধীনভাবে এবং নিরাপদে ফুটপাত দিয়ে চলাচল করতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন আদালতের এই রুলের জবাবে কী ধরনের আইনি যুক্তি উপস্থাপন করে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই জবাব আদালতে দাখিল করার কথা রয়েছে।
ফুটপাত এবং হকার সমস্যাটি কেবল আইনের মারপ্যাঁচে সীমাবদ্ধ নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে বিশাল এক অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা। তাই আদালত এই বিষয়ে শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত দেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো নগরবাসী।

