বাংলাদেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে টেনে তুলতে আসন্ন বাজেটে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে জিডিপির এক শতাংশের নিচে থাকা স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ অবশেষে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে যাচ্ছে। বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসে।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার জানিয়েছেন, দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করতে আসন্ন বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, গত অর্থবছরে এই বরাদ্দের পরিমাণ ছিল জিডিপির মাত্র ০.৬৭ শতাংশ।
রাজধানীর মহাখালীতে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনটি মূলত দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৬ উপলক্ষ্যে ডাকা হয়েছিল। সেখানে ড. জিয়াউদ্দিন স্বীকার করেন যে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরে চরম অর্থসংকটের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ নির্দেশনায় এবার আমরা বড় পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছি।” এই বর্ধিত অর্থ প্রধানত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বা প্রাইমারি হেলথকেয়ারকে ঢেলে সাজাতে ব্যয় করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সরকারের নতুন এই পরিকল্পনার অন্যতম চমক হলো তৃণমূল পর্যায়ে বিশাল কর্মীবাহিনী নিয়োগ। দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন এবং শহরাঞ্চলের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে ‘প্রাইমারি হেলথকেয়ার ইউনিট’ গড়ে তোলার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্তত এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে সরকার।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই স্বাস্থ্যকর্মীরা সরাসরি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেবেন। ড. জিয়াউদ্দিন জানান, প্রতিটি পরিবার মাসে অন্তত একবার একজন স্বাস্থ্যকর্মীর দেখা পাবেন। এটি হবে এক ধরনের নিবিড় স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের সদস্যদের ব্লাড সুগার, রক্তচাপ পরীক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন করবেন। এর পাশাপাশি গর্ভবতী নারীদের কাউন্সেলিং এবং পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের শারীরিক বিকাশের বিষয়টিও তারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবেন।
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ আনতে প্রতিটি নাগরিককে একটি করে ‘ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড’ দেওয়ার পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। রোগীর প্রাথমিক শারীরিক অবস্থার তথ্য এই কার্ডে সংরক্ষিত থাকবে। প্রয়োজনে তৃণমূলের ইউনিট থেকে রোগীদের উপজেলা বা টারশিয়ারি হাসপাতালে রেফার করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে দেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ড. জিয়াউদ্দিন এর জন্য অতীতের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ২০২০ সালের পর থেকে কার্যকর কোনো ক্যাম্পেইন না হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “বিগত সরকারের সময় টিকাদান কর্মসূচির তথ্যে ব্যাপক বিকৃতি ঘটানো হয়েছিল। ফলে অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গিয়েছিল, যা এখন সংক্রমণের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস টিকাদান কর্মসূচির অগ্রগতি তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশের ১৮টি জেলার উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলা ও ১৩টি পৌরসভায় গত ৫ এপ্রিল থেকে প্রথম ধাপের ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছিল।
পরবর্তীতে ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ ময়মনসিংহ ও বরিশালে দ্বিতীয় ধাপের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। গত ২০ এপ্রিল থেকে এই টিকাদান কার্যক্রম দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং বর্তমানে তা পুরোদমে সচল রয়েছে।
ডিজিএইচএসের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। স্বাস্থ্য মহাপরিচালকের দাবি, এটি তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় শতভাগ। যেসব এলাকায় প্রথম ধাপে টিকা দেওয়া হয়েছে, সেখানে সংক্রমণের হার ইতিমধ্যে কমতে শুরু করেছে।
অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, সাধারণত টিকা নেওয়ার তিন সপ্তাহ পর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। ফলে আশা করা যাচ্ছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দেশে হামের প্রকোপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে। তিনি অভিভাবকদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন।
মহাপরিচালক বলেন, “অনেক শিশু হয়তো নিয়মিত ইপিআই কার্যক্রমের আওতায় দুই ডোজ টিকা পেয়েছে। কিন্তু এই বিশেষ ক্যাম্পেইনের টিকাটি তাদের বাড়তি সুরক্ষা দেবে। তাই কোনো শিশু যেন এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জিডিপির ১ শতাংশ বরাদ্দের সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক হলেও তা বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা এবং নতুন এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মীর সঠিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে শহরকেন্দ্রিক হওয়ার কারণে প্রান্তিক মানুষ সঠিক সেবা থেকে বঞ্চিত। সরকারের এই নতুন পরিকল্পনা যদি সত্যিকার অর্থেই ওয়ার্ড পর্যায়ে কার্যকর হয়, তবে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বরং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি। রেফারেল সিস্টেম কার্যকর করতে হলে বড় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমানো দরকার।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত কর্মকর্তারা অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন যে, আসন্ন বাজেটে কেবল অবকাঠামো নয়, বরং জনবল এবং প্রযুক্তিতেও সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করা হবে। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে স্মার্ট হেলথ কার্ড হবে এই খাতের প্রধান ভিত্তি।
স্বাস্থ্য খাতের এই নতুন রুপান্তর কেবল সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর করছে না, বরং তৃণমূলের সাধারণ মানুষের সচেতনতা এবং সহযোগিতাও এখানে বড় ফ্যাক্টর। সরকারের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল হলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মানচিত্র বদলে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের এই মে মাসটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী বাজেটে এই প্রতিশ্রুতির পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে কি না।

