অবশেষে দীর্ঘ দুই দশকের প্রতীক্ষা আর আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটল। ২৭তম বিসিএসের নিয়োগবঞ্চিত আরও ৯৬ জন প্রার্থীকে ক্যাডার সার্ভিসে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে আজ বুধবার এই সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) সুপারিশের ভিত্তিতে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা কাটিয়ে এই ৯৬ জন এখন দেশের শীর্ষ প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ হতে যাচ্ছেন। তবে এই নিয়োগের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও অম্লমধুর সংগ্রামের ইতিহাস।
মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, নবনিযুক্ত এই কর্মকর্তাদের আগামী ১৮ মে’র মধ্যে সংশ্লিষ্ট ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় বা বিভাগের নির্ধারিত কার্যালয়ে যোগদান করতে হবে। যদি এর মধ্যে বিশেষ কোনো নির্দেশনা না আসে, তবে ওই তারিখেই তারা কর্মস্থলে যোগ দেবেন।
সময়সীমা নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, যদি কোনো প্রার্থী নির্ধারিত তারিখে যোগদান করতে ব্যর্থ হন, তবে ধরে নেওয়া হবে তিনি চাকরিতে যোগ দিতে ইচ্ছুক নন। সেক্ষেত্রে তার নিয়োগপত্র সরাসরি বাতিল বলে গণ্য হবে।
এই নিয়োগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রার্থীদের ‘সিনিয়রিটি’ বা জ্যেষ্ঠতা রক্ষা। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই ৯৬ জন কর্মকর্তার জ্যেষ্ঠতা তাদের মূল ব্যাচের প্রথম নিয়োগের তারিখ থেকেই কার্যকর হবে। অর্থাৎ, ২০০৮ সালে যারা ২৭তম বিসিএসে প্রথম দফায় নিয়োগ পেয়েছিলেন, তাদের সমান জ্যেষ্ঠতা পাবেন এই প্রার্থীরাও।
প্রশাসনিক পরিভাষায় একে বলা হয় ‘ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা’। তবে এই দীর্ঘ সময় যারা চাকরিতে ছিলেন না, তারা আগের কোনো বকেয়া আর্থিক সুবিধা বা বেতন-ভাতা দাবি করতে পারবেন না। তারা চাকরিতে যোগ দেওয়ার দিন থেকেই নিয়মিত বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্য হবেন।
এই নিয়োগের শেকড় লুকিয়ে আছে ২০০৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ইতিহাসে। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ২৭তম বিসিএসের প্রথম মৌখিক পরীক্ষার ফলাফল বাতিল করেছিল। এরপর দ্বিতীয়বার মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়, যেখানে প্রথম দফার অনেক সফল প্রার্থী বাদ পড়েন।
বাতিল হওয়া প্রার্থীরা এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। শুরু হয় এক দীর্ঘ আইনি লড়াই। ২০০৮ সালে হাইকোর্ট প্রথম দফার মৌখিক পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তকে বৈধতা দিলেও প্রার্থীরা হাল ছাড়েননি। তারা আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন।
বছরের পর বছর ঝুলে থাকার পর গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এক ঐতিহাসিক রায় দেন। আদালত সরাসরি ১ হাজার ১৩৭ জন বঞ্চিত প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। আদালতের এই রায়টি ছিল প্রার্থীদের দীর্ঘ বঞ্চনার বিরুদ্ধে এক বড় বিজয়।
আদালতের সেই নির্দেশনার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ধাপে ধাপে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করে। এর আগে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ৬৭৩ জন প্রার্থীকে নিয়োগ দিয়ে একটি বড় প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। আজকের ৯৬ জনের নিয়োগ সেই ধারাবাহিকতারই একটি অংশ।
নতুন এই কর্মকর্তাদের নিয়োগের মাধ্যমে ২৭তম বিসিএসের অমীমাংসিত অধ্যায়টি ক্রমশ সমাপ্তির দিকে এগোচ্ছে। তবে এই যাত্রায় অনেকেরই চাকরির বয়স প্রায় শেষের দিকে। কেউ কেউ হয়তো জীবনের সেরা সময়টি হারিয়েছেন আদালতের বারান্দায় ঘুরে।
প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় মনে করছে, এই নিয়োগের ফলে সিভিল সার্ভিসে অভিজ্ঞ এবং দক্ষ জনবল যুক্ত হবে। যদিও তারা দেরিতে যোগদান করছেন, কিন্তু তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর ধৈর্য পেশাগত জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আজকের এই প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়গুলো ইতোমধ্যে এই কর্মকর্তাদের বরণ করে নিতে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। তাদের যোগদানের পর বিভিন্ন জেলায় বা কেন্দ্রীয় দপ্তরে পদায়ন করা হবে।
২৭তম বিসিএস বাংলাদেশের নিয়োগ ইতিহাসে একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বারবার নিয়ম পরিবর্তন আর রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে এই ব্যাচটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আজকের এই ৯৬ জনের নিয়োগ সেই ক্ষতে কিছুটা হলেও প্রলেপ দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা জানিয়েছেন, এটি কেবল একটি চাকরির নিয়োগ নয়, বরং তাদের হারানো মর্যাদা ফিরে পাওয়ার লড়াই ছিল। ১৮ মে তাদের জন্য কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, বরং জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরুর দিন।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় পর এই নিয়োগ কার্যকর করার মাধ্যমে আইনের শাসনের প্রতিফলন ঘটেছে। একইসাথে রাষ্ট্রের উচিত ভবিষ্যতে এ ধরনের বিসিএস জট বা আইনি জটিলতা এড়াতে সরকারি কর্ম কমিশনকে আরও স্বাধীন ও স্বচ্ছভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া।
আপাতত সবার চোখ ১৮ মে’র দিকে, যখন এই ৯৬ জন তাদের দীর্ঘ কাঙ্ক্ষিত চেয়ারে বসবেন। তাদের পেশাগত জীবন এখন থেকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে, যেখানে তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার ধৈর্যই হবে সবচেয়ে বড় শক্তি।

