বাংলাদেশের সীমান্ত সুরক্ষায় কোনো ধরনের শিথিলতা প্রদর্শন করা হবে না এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে যেকোনো অমীমাংসিত ইস্যুতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান খোঁজা হবে বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিশেষ করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ বা ‘পুশইন’ চেষ্টার বিষয়ে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার বিকেলে সচিবালয়ে আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং পশুর হাটের নিরাপত্তা বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এসব কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন ভারতের সীমান্ত নীতি নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে নানামুখী উদ্বেগ কাজ করছে।
সীমান্তে ভারতের নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে সংবাদকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশ সবসময়ই সমান মর্যাদার ভিত্তিতে বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে। ভারতের কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনের ফলাফল কী হলো বা সেখানে কী রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে, তা তাদের একান্তই অভ্যন্তরীণ বিষয়।
তিনি আরও যোগ করেন, যদি ভারত তাদের সীমানার ভেতরে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ বজায় রেখে কাঁটাতারের বেড়া দিতে চায়, তবে সেটি নিয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বা তাদের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো তথ্য আমাদের জানানো হয়নি। যদি তেমন কিছু ঘটে, তবে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে টেবিলে বসবে।
সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার বা ‘পুশইন’ করার আশঙ্কার কথা নাকচ করে না দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিবি-কে (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, “আমাদের সীমান্ত দিয়ে যাতে কোনো ধরনের অনুপ্রবেশ না ঘটে, সে বিষয়ে বিজিবি সর্বদা জাগ্রত রয়েছে। যেকোনো মূল্যে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব।”
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাব বাংলাদেশে কোনো সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা তৈরি করবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক এবং স্থিতিশীল রাষ্ট্র। কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের রাজনীতির কারণে এ দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সরকার যেকোনো ধরণের উস্কানি দমনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।
ব্রিফিংয়ের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল আসন্ন ঈদুল আজহার প্রস্তুতি। মন্ত্রী জানান, কোরবানির পশুর হাটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হবে। সেই সঙ্গে জাল টাকা শনাক্তকরণ মেশিন এবং পশুর হাটে চাঁদাবাজি বন্ধে প্রতিটি বড় হাটে ভ্রাম্যমাণ আদালত সক্রিয় থাকবে। ব্যবসায়ীরা যাতে নির্ভয়ে টাকা বহন করতে পারেন, তার জন্য বিশেষ এসকর্ট সুবিধা দেওয়া হবে।
সড়কপথের দুর্ভোগ কমাতে এবার সরকার আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন মহাসড়কে চলাচল করতে দেওয়া হবে না। সড়ক ও জনপথ বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে মহাসড়কের গর্তগুলো সংস্কার করা হয়। ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা যাতে নির্বিঘ্ন হয়, সেদিকে সরকার কড়া নজর রাখছে।
নদীবন্দরগুলোতে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই এবং পশু পরিবহনের ক্ষেত্রে অনিয়ম রোধেও বিশেষ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। ফেরিঘাটগুলোতে দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে এবং লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন রুখতে কোস্ট গার্ড এবং নৌ-পুলিশ কাজ করবে। কোনো যাত্রী বা পশু ব্যবসায়ী যাতে ঘাটে এসে হেনস্তার শিকার না হন, তার জন্য কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশবাসীর প্রতি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকারের গৃহীত বহুমুখী পদক্ষেপের ফলে এবার দেশবাসী অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ এবং উৎসবমুখর পরিবেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করতে পারবেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আর নাগরিক নিরাপত্তা বজায় রাখাই হবে এই ঈদের প্রধান অগ্রাধিকার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সংবাদ সম্মেলনে বিজিবি প্রধান, আইজিপি এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য কেবল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বার্তা নয়, বরং সীমান্ত ইস্যুতে প্রতিবেশী দেশের প্রতি একটি সূক্ষ্ম কূটনৈতিক অবস্থানও বটে।
ঈদুল আজহার সময় সীমান্ত এলাকাগুলোতে পশুর চোরাচালান বন্ধেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। বিজিবি-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন কোনোভাবেই অবৈধ পথে পশু আনা-নেওয়া না হয়। বৈধ ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা এবং সীমান্ত সুরক্ষাকে এক সুতোয় বেঁধে নতুন এক নিরাপত্তা বলয় তৈরির চেষ্টা করছে বর্তমান সরকার।
সব মিলিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আজকের ব্রিফিংটি ছিল একাধারে সতর্কতামূলক এবং আশাব্যঞ্জক। সীমান্ত নিয়ে যেমন তিনি সার্বভৌমত্বের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন, তেমনি ঈদের আনন্দকে ম্লান করতে পারে এমন যেকোনো পরিস্থিতি দমনে সরকারের দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করেছেন। এখন দেখার বিষয়, মাঠ পর্যায়ে এই নির্দেশনার বাস্তবায়ন কতটুকু সফল হয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সীমান্ত এবং মেগা ফেস্টিভ্যালগুলো যখন একই রেখায় চলে আসে, তখন প্রশাসনের প্রতিটি স্তরের পেশাদারিত্বের পরীক্ষা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আজ সেই পরীক্ষারই একটি খসড়া রূপরেখা জাতির সামনে তুলে ধরলেন।
সচিবালয়ের এই বৈঠকটি প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলে। প্রতিটি স্তরের কর্মকর্তারা তাদের নিজ নিজ এলাকার সমস্যা ও সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠক শেষে মন্ত্রীর আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠ বলে দিচ্ছে, সরকার নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো আগেভাগেই পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ছক কষে ফেলেছে। এখন কেবল অপেক্ষা একটি সুন্দর ও নিরাপদ ঈদের।
পরিশেষে, সীমান্ত হত্যাকাণ্ড ও কাঁটাতার ইস্যুতে দেশের মানুষের যে আবেগ ও উদ্বেগ রয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আজকের বক্তব্যে তার প্রতিফলন দেখা গেছে। তিনি সরাসরি সংঘাতের বদলে আলোচনার পথ বেছে নেওয়ার কথা বলে পরিপক্ব রাজনীতির পরিচয় দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিজিবি-কে ‘জাগ্রত’ থাকার নির্দেশ দিয়ে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিলেন, তা জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে বলে আশা করা যায়।

