তীব্র দাবদাহ আর লোডশেডিংয়ের লড়াইয়ের মাঝে নাভিশ্বাস ওঠা জনজীবনে কিছুটা স্বস্তির খবর নিয়ে এলো সরকার। আসন্ন ঈদুল আজহার আমেজ আর সাধারণ মানুষের কেনাকাটার প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দিয়ে দোকানপাট ও শপিংমল খোলা রাখার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। আজ মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হওয়া নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঈদের দিন পর্যন্ত সারা দেশের বিপণি বিতানগুলো রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে।
চলমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকার গত কিছুদিন ধরেই সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সব ধরণের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের কড়াকড়ি আরোপ করেছিল। তবে কোরবানির ঈদের আগে এই বিধিনিষেধ ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কায় ব্যবসায়ী মহলে কিছুটা উদ্বেগ ছিল। আজ বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সেই উদ্বেগের অবসান ঘটানো হয়।
সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সই করা ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আসন্ন উৎসবের মৌসুমে ক্রেতা এবং বিক্রেতা—উভয় পক্ষের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই সরকার এই নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। মূলত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার পরই সময়সীমা বাড়ানোর এই সবুজ সংকেত মিলেছে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় ব্যবসায়ীদের ওপর কিছু শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান হলো—অতিরিক্ত কোনো আলোকসজ্জা বা সাজসজ্জায় বিদ্যুৎ অপচয় করা যাবে না। কেবল বেচাকেনার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেই রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখা যাবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সন্ধ্যা ৭টায় দোকান বন্ধের সিদ্ধান্তে তারা বড় ধরণের লোকসানের মুখে পড়ার আশঙ্কায় ছিলেন। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ যারা দিনের কাজ শেষে সন্ধ্যায় বাজারে বের হন, তাদের জন্য ৭টা ছিল খুবই কম সময়। এখন রাত ১০টা পর্যন্ত সময় পাওয়ায় ঈদের বাজার জমে উঠবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের ঘাটতি সমন্বয় করতেই এই রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। তবে ধর্মীয় উৎসবের আবেগকে সম্মান জানিয়ে এবং দেশের অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব ধরে রাখতে এই সাময়িক পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে ঈদের পর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পুনরায় আগের নিয়মে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
রাজধানীর নিউ মার্কেট, বসুন্ধরা সিটি এবং যমুনা ফিউচার পার্কের মতো বড় শপিংমলগুলোতে আজ বিকেল থেকেই বাড়তি প্রস্তুতির আমেজ দেখা গেছে। দোকানিরা বলছেন, সময় বাড়ানোর ফলে এখন ক্রেতারা অনেকটা ধীরেসুস্থে পণ্য দেখে কেনার সুযোগ পাবেন। এতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাও কিছুটা সহজ হবে।
তবে সরকার সতর্ক করে দিয়েছে যে, রাত ১০টার পর কোনো অজুহাতেই দোকান খোলা রাখা যাবে না। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের এই জাতীয় লড়াইয়ে ব্যবসায়ীদেরও দায়বদ্ধ থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। ডিপিডিসি এবং ডেসকোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্ধিত সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় লোড ব্যালেন্সিং করার কাজ তারা শুরু করেছে।
উল্লেখ্য, এবারের ঈদুল আজহায় পশুর হাট এবং ঈদ বাজারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসনও বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। রাত ১০টা পর্যন্ত মার্কেট খোলা থাকায় গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে টহল এবং সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ছিনতাই বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।
সাধারণ ক্রেতারা এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। ধানমন্ডির বাসিন্দা এক গৃহিণী জানান, “দিনের বেলায় তীব্র গরমের কারণে বাচ্চাদের নিয়ে বের হওয়া কঠিন ছিল। এখন রাত পর্যন্ত সময় পাওয়ায় রাতের দিকে কেনাকাটা করা সহজ হবে। তবে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নিয়মটি সবাই মানলে ভালো হয়।”
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঈদের এই কয়েকদিন ব্যবসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সারা বছরের আয়ের একটি বড় অংশ এই উৎসবের মৌসুমে আসে। তাই সরকারের এই নমনীয়তা কেবল ক্রেতাদের সুবিধা নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকেও চাঙ্গা রাখবে।
সব মিলিয়ে, বিদ্যুৎ সংকটের চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখেই উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হলো বাংলাদেশে। সরকার ও ব্যবসায়ীদের এই সমন্বিত পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হয় এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কতটুকু কমে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে আপাতত আলোকসজ্জাহীন নিস্তব্ধ শপিংমলগুলোতে রাত ১০টা পর্যন্ত মানুষের কোলাহল ফেরার বিষয়টি একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

