বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ও সমালোচিত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবায় আমূল পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করতে এবার তুরস্কের প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘সেলেবি এভিয়েশন’ বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম প্রসারের আনুষ্ঠানিক আগ্রহ প্রকাশ করেছে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই প্রস্তাবনা উঠে আসে।
বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আফরোজা খানম এবং প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সঙ্গে সেলেবি এভিয়েশনের প্রতিনিধি দল বিস্তারিত আলোচনা করেন। এসময় বাংলাদেশে নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস সেনও উপস্থিত ছিলেন। কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক—উভয় দিক থেকেই এই আলোচনাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং মূলত একটি বিমানবন্দরের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত। উড়োজাহাজ অবতরণের পর থেকে পুনরায় উড্ডয়ন পর্যন্ত মালামাল ওঠানো-নামানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং কার্গো ব্যবস্থাপনা—সবই এর অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে এই সেবা নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে নানা অভিযোগ রয়েছে। সেলেবি এভিয়েশনের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের আগমন সেই অভিযোগের অবসান ঘটাতে পারে।
মন্ত্রী আফরোজা খানম বৈঠকে তুরস্কের প্রতিনিধিদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের আধুনিকায়ন এখন সরকারের অগ্রাধিকার। বিশেষ করে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার যে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে, সেখানে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য দক্ষ অংশীদার প্রয়োজন। তিনি এই কাজে সেলেবি এভিয়েশনকে তাদের সক্ষমতা প্রদর্শনের আহ্বান জানান।
প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত যাত্রীসেবার মান নিয়ে কোনো আপস করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন। তিনি সেলেবি এভিয়েশনের প্রতিনিধিদের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘কনসেপ্ট পেপার’ বা কর্মপরিকল্পনা চেয়েছেন। এতে তারা কীভাবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্বমানের যাত্রীসেবা নিশ্চিত করবে, তার একটি রূপরেখা থাকবে।
তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস সেন বলেন, বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে ঐতিহাসিক ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এই বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব কেবল ব্যবসার খাতিরে নয়, বরং দুই দেশের অর্থনৈতিক মেলবন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে। সেলেবি এভিয়েশন বিশ্বের বিভিন্ন বড় বিমানবন্দরে সফলতার সঙ্গে কাজ করছে এবং সেই অভিজ্ঞতা তারা বাংলাদেশেও কাজে লাগাতে চায়।
আলোচনায় উঠে আসে ‘পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ’ বা পিপিপি মডেলের কথা। বর্তমানে এককভাবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা পরিচালিত হলেও, সেবার মান বাড়াতে বেসরকারি খাতের দক্ষ ব্যবস্থাপনাকে যুক্ত করার বিষয়ে সরকার ইতিবাচক। বিশেষ করে তুরস্কের বিনিয়োগকারীরা এই খাতে বড় ধরনের পুঁজি ও প্রযুক্তি নিয়ে আসতে আগ্রহী।
মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আখতার জানান, বিদেশি কোনো কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সেলেবি এভিয়েশন যেহেতু বৈশ্বিক বাজারে একটি প্রতিষ্ঠিত নাম, তাই তাদের প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করা হচ্ছে। তারা যদি যথাযথ পরিকল্পনা জমা দিতে পারে, তবে তারা অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবি রাখে।
বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে প্রতিযোগিতা তৈরি হলে বিমানবন্দরগুলোতে চুরির ঘটনা কমবে এবং ব্যাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়বে। অনেক সময় দেখা যায়, উড়োজাহাজ ল্যান্ড করার পরও যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাগেজের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। বিদেশি দক্ষ কোম্পানি যুক্ত হলে এই সময় কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
কক্সবাজার বিমানবন্দরকে ঘিরে সরকারের স্বপ্ন অনেক বড়। সমুদ্রের কোল ঘেঁষে তৈরি হওয়া এই রানওয়েতে বড় বড় বিদেশি এয়ারলাইন্স অবতরণ করবে। সেখানে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজ যদি সেলেবির মতো কোনো প্রতিষ্ঠান পায়, তবে বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে বলে বৈঠকে আশা প্রকাশ করা হয়।
পর্যটন খাতের উন্নয়নে বিমানবন্দর যে গেটওয়ে হিসেবে কাজ করে, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে আফরোজা খানম বলেন, পর্যটকদের প্রথম অভিজ্ঞতা হয় বিমানবন্দরে। তাই আমাদের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং হতে হবে নিখুঁত। তুরস্কের সহযোগিতায় আমরা একটি আধুনিক ও স্মার্ট এভিয়েশন সেক্টর গড়ে তুলতে চাই।
বৈঠক শেষে সেলেবি এভিয়েশনের প্রতিনিধিরা জানান, তারা খুব দ্রুতই তাদের কারিগরি ও বাণিজ্যিক প্রস্তাবনা সরকারের কাছে জমা দেবেন। তারা আশাবাদী যে, বাংলাদেশে কাজ করার সুযোগ পেলে তারা দক্ষিণ এশিয়ায় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের একটি নতুন স্ট্যান্ডার্ড বা মানদণ্ড তৈরি করতে পারবেন।
সম্প্রতি সৌদি আরবের ‘রিয়াদ এয়ার’ ঢাকার আকাশে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং ইরানের ‘মাহান এয়ার’ও ফ্লাইটের অনুমতি চেয়েছে। একের পর এক আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স যখন বাংলাদেশে আসার আগ্রহ দেখাচ্ছে, তখন গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং খাতের এই উন্নয়ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
তুরস্ক ও বাংলাদেশের এই সম্ভাব্য চুক্তি কেবল পর্যটন নয়, বরং কার্গো পরিবহনের ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখবে। রপ্তানি বাণিজ্যে বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে সঠিক সময়ে পণ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। সেলেবি এভিয়েশন তাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এই খাতে গতির সঞ্চার করতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, সচিবালয়ের এই সৌজন্য সাক্ষাৎ কেবল শিষ্টাচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি ছিল বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের আধুনিকায়নের একটি শক্ত ভিত্তিপ্রস্তর। সরকারের ইতিবাচক সাড়া এবং তুরস্কের আগ্রহ—উভয়ই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, খুব শিগগিরই বাংলাদেশের আকাশপথে বড় ধরনের কোনো সুসংবাদ আসতে যাচ্ছে।
এখন দেখার বিষয়, সেলেবি এভিয়েশনের জমা দেওয়া কনসেপ্ট পেপার সরকারের মানদণ্ডে কতটা উত্তীর্ণ হয়। তবে প্রাথমিক আলোচনায় যে উষ্ণতা দেখা গেছে, তাতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের একচেটিয়া আধিপত্যের অবসান ঘটার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এটি বাস্তবায়ন হলে সাধারণ যাত্রীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটবে—এমনটিই প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

