ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অডিটরিয়ামটি আজ এক ভিন্নধর্মী প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর ছিল। প্রথাগত রাজনৈতিক ভাষণের বাইরে গিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগরদের মুখোমুখি হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘ আলাপচারিতায় উঠে এলো আগামীর বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা, অতীতের দুর্নীতির ক্ষত আর স্থিতিশীল রাজনীতির গুরুত্ব।
প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সোজাসাপ্টা ভাষায় শিক্ষার্থীদের বললেন, “আপনারা পরিবর্তন চান, উন্নয়ন চান। কিন্তু মনে রাখবেন, স্থিতিশীল পরিবেশ ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না।” তাঁর কণ্ঠে ছিল একাধারে প্রত্যাশা ও সতর্কবার্তা। তিনি স্পষ্ট করে দিলেন যে, বারবার ভেঙে গড়ে তোলার বৃত্ত থেকে দেশকে বের করে আনতে হবে।
মঙ্গলবার বিকেলে অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরী অডিটরিয়ামে আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ১৫৬ জন শিক্ষার্থী যোগ দেন। সভার পরিবেশ ছিল বেশ খোলামেলা। ১৭ জন শিক্ষার্থী সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার সুযোগ পান। শিক্ষা, কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে গত শাসনের দুর্নীতি—সবই উঠে আসে আলোচনায়।
একজন শিক্ষার্থীর প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ধীরে ধীরে সবকিছু গড়ে তুলতে হলে দেশে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ প্রয়োজন। আমরা যদি তা না পারি, তবে কোনো অর্জনই স্থায়ী হবে না। একবার কিছু তৈরি হবে, আবার তা রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভেঙে পড়বে—এই সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া দরকার।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, উন্নয়নের প্রতিটি ইটের সুরক্ষায় শিক্ষার্থীদের অতন্দ্র প্রহরী হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, রাজপথের হইচইয়ের চেয়ে সংসদীয় বিতর্কেই রাজনীতির প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত। আলোচনার টেবিলে বসে যুক্তি দিয়ে দেশ গড়ার পরিকল্পনার ওপর তিনি বেশি গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “দেশ পরিচালনার দায়িত্ব একদিন আপনাদের হাতেই আসবে। তাই আপনাদের শক্ত হতে হবে, অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে সব মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পক্ষে জনমত তৈরি করুন। কারণ আপনারাই ভবিষ্যৎ।”
শিক্ষার মানোন্নয়ন ও বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তিনি শিক্ষার্থীদের ভাষা দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেন। বাংলা ও ইংরেজির বাইরেও অন্তত একটি তৃতীয় ভাষা শেখার পরামর্শ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার স্কুল পর্যায়ে ৪ থেকে ১২ বছর বয়সীদের জন্য এই সুবিধা নিশ্চিত করার কাজ শুরু করেছে।
সাংস্কৃতিক চর্চার অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এক শিক্ষার্থী। জবাবে প্রধানমন্ত্রী একমত পোষণ করে বলেন, “সংস্কৃতিহীন জাতি এগিয়ে যেতে পারে না।” তিনি জানান, ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ এবং সংগীত শিক্ষার মতো উদ্যোগগুলো শিকড় থেকে কাজ শুরু করেছে, যার পূর্ণ সুফল পেতে হয়তো এক দশক সময় লাগবে।
মতবিনিময়ের এক পর্যায়ে বিগত সরকারের সময়ের দুর্নীতির প্রসঙ্গ উঠে আসে। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে বালিশ কেনাকাটার অবিশ্বাস্য দুর্নীতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী কিছুটা বিস্ময় ও হাস্যরসের সঙ্গেই বলেন, “একটি বালিশের দাম ৮০ হাজার টাকা! এত দামি বালিশে কি আদৌ মানুষের ঘুম হয়?”
তিনি শিক্ষার্থীদের সামনে বিগত আমলের অর্থ পাচার এবং মেগা প্রকল্পের আড়ালে হওয়া দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বাস করেন, আগামীর তরুণ সমাজ যেন এই ধরনের লুটপাটের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে, সেজন্যই এই সত্যগুলো বারবার বলা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী যখন কথা বলছিলেন, তখন হলরুমের পিনপতন নীরবতা বলে দিচ্ছিল শিক্ষার্থীরা তাঁর প্রতিটি শব্দ গভীরভাবে অনুধাবন করছেন। তিনি কেবল রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নন, বরং একজন অভিজ্ঞ অভিভাবক হিসেবে শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এবং সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খান। এ ছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীর এই সরাসরি মতবিনিময় সভায় অংশ নেন।
বিকেলে সভা শেষ করে হল থেকে বের হওয়ার সময় অনেক শিক্ষার্থীর চোখেমুখে দেখা গেছে নতুন এক সংকল্পের ছাপ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে একটি আধুনিক ও স্বচ্ছ বাংলাদেশ গড়ার যে আহ্বান প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, তা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়িয়ে সারা দেশের তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে পড়বে বলেই সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
দেশের রাজনীতিতে পেশিশক্তির বদলে যুক্তির জয়গান এবং ধ্বংসাত্মক কর্মসূচির বদলে আলোচনার সংস্কৃতি তৈরিই এখন সরকারের মূল লক্ষ্য। আর এই দীর্ঘযাত্রায় দেশের মেধাবী তরুণ সমাজকে পাশে পাওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আজ আবারও তাঁর গভীর আস্থার কথা পুনর্ব্যক্ত করলেন।

