রাজধানীর রাজপথে তপ্ত রোদে চার বছরের সন্তানকে কোলে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন ইসমাইল হোসেন। তার একমাত্র সন্তান রুমান হামে আক্রান্ত। তীব্র জ্বর, শ্বাসকষ্ট আর লাগাতার পাতলা পায়খানায় শিশুটির শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। কিন্তু বিদেশের মাটিতে নয়, খোদ রাজধানীর বুকেই চিকিৎসার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেও মিলছে না একটি শয্যা। ইসমাইলের আর্তনাদ আজ কেবল এক বাবার আকুতি নয়, বরং দেশের ভঙ্গুর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক নগ্ন প্রতিফলন।
সাত দিন আগে সামান্য জ্বর ও ডায়রিয়া দিয়ে শুরু হয়েছিল রুমানের অসুস্থতা। গত ১ মে তাকে মহাখালী কলেরা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার উন্নতি তো হয়ইনি, উল্টো দুই দিন আগে শরীরে দেখা দেয় হামের লালচে র্যাশ। এরপরই শুরু হয় এক অমানবিক ‘রেফারাল’ খেলা। কলেরা হাসপাতাল থেকে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, সেখান থেকে ডিএনসিসি হাসপাতাল, এরপর শিশু হাসপাতাল— কোথাও মেলেনি ঠাঁই।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গেলে জানানো হয়, এক বছরের বেশি বয়সী হামের রোগী তারা ভর্তি নেয় না। আবার ডিএনসিসি হাসপাতালে শয্যা খালি নেই বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। শিশু হাসপাতালে গিয়েও একই উত্তর— “জায়গা নেই”। দিনভর অসুস্থ শিশুকে নিয়ে রাজধানীর এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ঘুরে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত বাবা-মা শেষ পর্যন্ত ঘরে ফিরতে বাধ্য হন। বিনা চিকিৎসায় কাটে একটি রাত।
আজ সকালে আবারও ভাগ্য পরীক্ষায় নামেন ইসমাইল। এবার গন্তব্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক)। দুপুর ১২টায় চিকিৎসক তাকে ভর্তি করার সিদ্ধান্ত দিলেও বিকেল ৪টা পর্যন্ত ওয়ার্ডের সামনেই কাটাতে হয়েছে রুমানকে। মুমূর্ষু শিশুটি যখন কোলঘেঁষে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে, তখনো চলছি আমলাতান্ত্রিক ভর্তি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা।
রুমানের মা রুমা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “ডিএনসিসি হাসপাতালে অনেক অনুরোধ করেছিলাম, অন্তত কয়েকটা ওষুধ লিখে দিন। তারা কিছুই দিল না। আমার ছেলেটা আজ সকাল থেকে আটবার পাতলা পায়খানা করেছে। ও তো আর সহ্য করতে পারছে না।” তার এই অভিযোগ রাজধানীর নামিদামি সরকারি হাসপাতালগুলোর সংবেদনশীলতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে।
ফুটপাতে চা বিক্রি করে সংসার চালান ইসমাইল হোসেন। নিজেও শারীরিকভাবে অসুস্থ। সমাজের নিম্নবিত্ত শ্রেণির এই মানুষটির কাছে চিকিৎসা এখন এক বিলাসিতা। ইসমাইল আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা গরিব বলে কি আমাদের সন্তানের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার নেই? টাকা থাকলে হয়তো বড় কোনো ক্লিনিকে ভর্তি করতে পারতাম। কিন্তু আমাদের কপালে আল্লাহ সেটা রাখেননি।”
অথচ দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কড়া নির্দেশনা রয়েছে যে, হামের কোনো রোগীকে হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। গত ২১ এপ্রিল জারি করা এক জরুরি আদেশে বলা হয়েছে, শয্যা খালি না থাকলেও প্রয়োজনে অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করে চিকিৎসা দিতে হবে। কোনোভাবেই হামের উপসর্গ থাকা রোগীকে অন্যত্র রেফার করা যাবে না, যদি না সেটা অত্যন্ত জটিল কোনো কেস হয়।
অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, যদি কোনো হাসপাতাল এই নিয়ম লঙ্ঘন করে, তবে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে এর দায়ভার বহন করতে হবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। শয্যা সংকটের দোহাই দিয়ে মুমূর্ষু শিশুদের ফেরত পাঠানো এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। চিকিৎসকদের অবহেলা আর প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনায় পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
ঢামেক হাসপাতালের বারান্দায় ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর যখন চিকিৎসকদের কাছে দেরির কারণ জানতে চাওয়া হয়, তখন তারা জানান ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, রোগীর এক্স-রে রিপোর্ট আসতে দেরি হয়েছে। এছাড়া হাম ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে রাখা সম্ভব নয়। পুরো কেস স্টাডি লিখতে সময় লাগায় ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বিলম্ব হচ্ছে বলে দাবি করেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গরমে হামের প্রকোপ বাড়লে শিশুদের মধ্যে পানিশূন্যতা ও শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। রুমানের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই ঘটেছে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করতে না পারলে নিউমোনিয়া বা ব্রঙ্কাইটিসের মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই চিকিৎসার জন্য ইসমাইলদের মতো হাজারো মানুষকে লড়তে হচ্ছে অদৃশ্য এক দেয়ালের বিরুদ্ধে।
রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে। হামের মতো একটি জনস্বাস্থ্য সংকটে কেন এক বছরের বেশি বয়সী শিশুদের ভর্তি নেওয়া হবে না, তার কোনো সদুত্তর নেই কর্তৃপক্ষের কাছে। অন্যদিকে ডিএনসিসি বা শিশু হাসপাতালের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলো কেন জরুরি অবস্থায় ‘অতিরিক্ত শয্যা’র নির্দেশনা মানছে না, তা নিয়েও জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে।
স্বাস্থ্য খাতের এই সংকটের পেছনে কেবল অবকাঠামোগত অভাব নয়, বরং মানবিকতার অভাবকেই দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। সরকারি আদেশের তোয়াক্কা না করে মুমূর্ষু রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঠেলে দেওয়ার এই সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের। এর ফলে গ্রামীণ পর্যায় থেকে আসা রোগীরা যেমন ভোগান্তিতে পড়েন, তেমনি রাজধানীর নিম্নবিত্ত মানুষেরাও অসহায় হয়ে পড়েন।
ইসমাইল হোসেনের চোখের পানি আজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি আধুনিক রাষ্ট্রে চিকিৎসা সেবা কোনো করুণা নয়, বরং নাগরিক অধিকার। যখন একজন চা বিক্রেতা তার সন্তানের জীবনের জন্য হাসপাতালের বারান্দায় বসে স্রষ্টার কাছে বিচার চান, তখন বুঝতে হবে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি কতটা নড়বড়ে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলেও রুমানের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। তাকে শেষ পর্যন্ত একটি শয্যা দেওয়া হয়েছে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে, সরকারি সার্কুলার বা নির্দেশনার চেয়ে হাসপাতালের প্রশাসনিক জটিলতা অনেক বেশি শক্তিশালী। হামের প্রকোপ মোকাবিলায় কেবল শয্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং সংবেদনশীলতা বাড়ানো জরুরি।
অন্ধকার নামার আগে ইসমাইল শুধু একটি কথাই বারবার বলছিলেন— “টাকা নেই বলে কি আমার ছেলেটা এভাবেই কষ্ট পাবে?” এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনো সরকারি ফাইলেই মিলবে না। তবে রুমানের মতো হাজারো শিশুর জীবন বাঁচাতে হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে তাদের নিজস্ব নির্দেশনা কার্যকরে আরও কঠোর হতে হবে। অন্যথায়, চিকিৎসার অভাবে ঝরে পড়া প্রতিটি প্রাণের দায়ভার এড়ানো সম্ভব হবে না।
বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের চাপ বাড়ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার এবং আক্রান্তদের জন্য ডেডিকেটেড ওয়ার্ডের ব্যবস্থা না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোর রেফারাল চেইন কঠোরভাবে তদারকি করা প্রয়োজন যাতে কোনো শিশুকে চিকিৎসার অভাবে রাস্তায় ঘুরতে না হয়।
ইসমাইল হোসেনের সংগ্রাম কেবল তার একার নয়; এটি বাংলাদেশের হাজারো বঞ্চিত মানুষের প্রতিদিনের গল্প। আমরা হয়তো বড় বড় ভবনের হাসপাতাল গড়ছি, কিন্তু সেই ভবনের ভেতরে মানবিক সেবা নিশ্চিত করতে এখনো যোজন যোজন পিছিয়ে আছি। রুমান সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে কি না তা সময় বলবে, কিন্তু আমাদের এই চিকিৎসা ব্যবস্থা কি কখনো সুস্থ হবে? সেই প্রশ্নের উত্তর আজো অজানাই থেকে গেল।

