ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে বুক বেঁধেছিলেন বাবা জহুরুল হক। কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ার আগেই বড় করেছিলেন তাকে। পরম মমতায় বড় করা সেই সন্তান আজ ফিরল কফিনে বন্দি হয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের নিথর দেহ যখন ঢাকার মাটি স্পর্শ করল, তখন আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে তার বাবার গগণবিদারী আর্তনাদে।
সোমবার সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে লিমনের মরদেহবাহী বিমানটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। দীর্ঘ যাত্রা শেষে ছেলের দেহটি যখন স্ট্রেচারে করে বেরিয়ে আসছিল, তখন উপস্থিত স্বজনদের চোখের পানি বাঁধ মানেনি। বিমানবন্দরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মরদেহ গ্রহণ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তিনি নিহতের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে মরদেহটি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কাছে হস্তান্তর করেন।
ছেলের কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন বাবা জহুরুল হক। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, “আমি আমার ছেলে দুটোকে তিলে তিলে বড় করেছি। ওদের গায়ে কখনো একটা টোকাও দিইনি। কোনোদিন শারীরিক শাস্তি দিইনি। শাসন যা করেছি, সব মুখে। আমি স্বপ্নেও ভাবিনি আমার কলিজার টুকরাকে এভাবে মরতে হবে।”
লিমনের বাবা যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে, উচ্চশিক্ষার জন্য সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করে পাঠানো ছেলেটি এমন নৃশংস পরিণতির শিকার হবে। অশ্রুভেজা চোখে তিনি আরও বলেন, “সে শেষ মুহূর্তে কী যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছে, তা কেবল ওপরওয়ালাই জানেন। একজন বাবাকে কেন সন্তানের এই বীভৎস মৃত্যু সইতে হলো, তার উত্তর আমার জানা নেই।”
জামিল আহমেদ লিমন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় (ইউএসএফ) ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। তার মতো একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন অকাল ও নিষ্ঠুর প্রস্থান কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং দেশের জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি। তার সহপাঠী ও স্বজনদের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত শান্ত ও বিনয়ী স্বভাবের।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বিমানবন্দর থেকে লিমনের মরদেহ সরাসরি জামালপুরের মাদারগঞ্জে তার পৈত্রিক বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে মাগরিবের নামাজের পর জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। বাড়ির আঙিনায় শেষবারের মতো লিমনকে দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন গ্রামের মানুষ।
লিমনের এক আত্মীয় বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের জানান, লিমন কখনোই তার রুমমেটের সঙ্গে কোনো সমস্যার কথা পরিবারকে বলেনি। সব যোগাযোগই স্বাভাবিক ছিল। কোনোদিন কোনো ঝগড়া বা তিক্ততার আভাসও পাওয়া যায়নি। আকস্মিক এই হত্যাকাণ্ড তাই সবার কাছেই এক বড় রহস্য এবং গভীর ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
গত ১৬ এপ্রিল লিমন নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই উৎকণ্ঠা শুরু হয়। তার সঙ্গে একই সময়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন আরেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি। তাদের খোঁজ না পেয়ে সহপাঠীরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে লোমহর্ষক সব তথ্য। লিমনের রুমমেট মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুঘরবেহকে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আদালতের নথি থেকে জানা গেছে, লিমনের শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। হিশামের বিরুদ্ধে ‘ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার’ বা সর্বোচ্চ মাত্রার খুনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা তার কাছ থেকে একটি অস্ত্রও উদ্ধার করেছেন। এই হত্যাকাণ্ড কেন এবং কী কারণে ঘটানো হয়েছে, তা নিয়ে এখনো নিবিড় তদন্ত চলছে।
লিমনের পাশাপাশি নিখোঁজ হওয়া বৃষ্টির পরিণতি ছিল আরও ভয়াবহ। গত ২৬ এপ্রিল ফ্লোরিডার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের কাছের ম্যানগ্রোভ এলাকা থেকে এক জোড়া মাছশিকারি একটি কালো পলিথিন ব্যাগ উদ্ধার করেন। ভেতরে থাকা দেহাংশগুলো বৃষ্টির বলে পরে নিশ্চিত করে হিসলবরো কাউন্টি পুলিশ। এই জোড়া খুনের ঘটনায় পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের পাশাপাশি তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার ফ্লোরিডার টাম্পা বে এলাকার ইসলামিক সোসাইটিতে লিমনের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভিড় করেছিলেন। প্রবাসের মাটিতে একজন প্রতিভাবান শিক্ষার্থীর এমন করুণ সমাপ্তি মেনে নিতে পারছেন না কেউই।
লিমনের স্বজনরা এখন কেবল ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। তারা বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র— উভয় দেশের সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন যেন হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এবং বিচারের বিষয়ে তারা সার্বক্ষণিক নজর রাখছে।
একটি মেধার মৃত্যু, একটি সাজানো সংসারের স্বপ্নভঙ্গ এবং প্রবাসে অনিরাপদ জীবনের এই করুণ আখ্যান লিমনের লাশের মধ্য দিয়ে আরও একবার সামনে এল। যে পথে সাফল্যের বার্তা নিয়ে ফেরার কথা ছিল, সেই পথেই লিমন ফিরলেন লাশ হয়ে। মাদারগঞ্জের নিভৃত পল্লীতে আজ যখন মাটির নিচে তাকে শুইয়ে দেওয়া হবে, তখন হয়তো থেমে যাবে এক বাবার দীর্ঘশ্বাস, কিন্তু বিচারের দাবিটি জোরালো হয়েই থাকবে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে ফ্লোরিডার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ক্যাম্পাস জীবনের অভ্যন্তরীণ সংকট নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। তবে লিমনের পরিবারের কাছে এখন বড় সান্ত্বনা কেবল তার কবরের মাটিটুকু। মেধাবী এই তরুণের স্মৃতি আর তার বাবার সেই আর্তনাদ— “কল্পনাও করিনি ছেলে এভাবে মারা যাবে”— বহুকাল মানুষের মনে দাগ কেটে থাকবে।
প্রবাসে উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে বিভোর হাজারো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর কাছে লিমনের এই গল্প কেবল একটি সংবাদ নয়, বরং এক অজানা আতঙ্কের নাম। লিমনের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় দেশজুড়ে আজ দোয়া ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। স্বজনদের দাবি, লিমন আর বৃষ্টি যেন শেষ বিচারটুকু পান, যেন আর কোনো বাবাকে বিমানবন্দরের কার্গো গেটে দাঁড়িয়ে এমন বিলাপ করতে না হয়।

