জনসাধারণের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত থানাগুলোতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে এক কঠোর বার্তা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি থানাকে অবিলম্বে দালালমুক্ত করতে হবে। পুলিশি সেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কোনো ধরনের মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি সহ্য করা হবে না।
শনিবার দুপুরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত রমনা মডেল থানা পরিদর্শনকালে তিনি এই দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। ১৫ বছরের বেশি সময় পর নতুন এক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় পুলিশের কার্যক্রমে গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মন্ত্রীর এই ঝটিকা সফরটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্ত্রী যখন রমনা থানায় পৌঁছান, তখন সেখানে এক গুমোট ও গম্ভীর পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। তিনি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে থানার প্রতিটি কক্ষ, ডিউটি অফিসারের টেবিল এবং হাজতখানা ঘুরে দেখেন। হাজতখানার সার্বিক পরিবেশ এবং সেখানে থাকা ব্যক্তিদের আইনি অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও তিনি কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
পরিদর্শনকালে মন্ত্রী থানার ওসির কক্ষ থেকে শুরু করে ডিউটি অফিসারের ডেস্কেও সময় কাটান। সাধারণ মানুষ সেবা নিতে এসে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সরাসরি কথা বলেন উপস্থিত সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “থানায় অভিযোগ দিতে বা জিডি করতে কোনো দালালের প্রয়োজন নেই। সাধারণ মানুষ সরাসরি পুলিশের কাছে আসবে এবং তাদের কথা বলবে।”
পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পেশাদারিত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে পুলিশের ভাবমূর্তির যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে হলে সততার কোনো বিকল্প নেই। প্রতিটি পুলিশ সদস্যকে অত্যন্ত বিনম্র কিন্তু দৃঢ়তার সঙ্গে সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দালালদের সঙ্গে যদি কোনো পুলিশ সদস্যের আঁতাত বা সখ্যতা পাওয়া যায়, তবে কেবল বিভাগীয় ব্যবস্থাই নয়, বরং কঠোর আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে। দুর্নীতির প্রশ্নে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলা যারা করবেন, তারা এই নতুন প্রশাসনে জায়গা পাবেন না।”
থানায় কর্মরত পুলিশ সদস্যদের নানা প্রতিকূলতা ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টার বিষয়টিও মন্ত্রীর আলোচনায় উঠে আসে। তিনি নিচুতলার পুলিশ সদস্যদের পারিবারিক ও পেশাগত সমস্যার কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনেন। পুলিশ সদস্যদের মানসিক চাপ কমাতে এবং আবাসন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়ে সরকার কাজ করছে বলেও তিনি তাদের আশ্বস্ত করেন।
মন্ত্রী বলেন, “আমরা জানি পুলিশ সদস্যরা অনেক চাপের মধ্যে কাজ করেন। কিন্তু সেই চাপের অজুহাতে সাধারণ মানুষের ওপর রাগ ঝাড়া বা সেবা দিতে অস্বীকার করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতন পাওয়া প্রতিটি সরকারি কর্মচারীর প্রধান কাজ হলো জনগণের সেবা করা।”
বর্তমানে দেশের প্রতিটি থানায় যে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, তাকে স্থায়িত্ব দেওয়ার জন্য নিয়মিত তদারকির ওপর জোর দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, কেবল রমনা থানা নয়, পর্যায়ক্রমে দেশের সব থানা পরিদর্শনে যাবে বিশেষ টিম। কোনো থানায় যদি অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়, তবে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে ঢাকা মহানগরের থানাগুলোর ওপর চাপ বেশি থাকে। রাজধানীর আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে আরও জনবান্ধব হওয়ার পরামর্শ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, জনগণের সহায়তা ছাড়া অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। আর সেই সহায়তা তখনই পাওয়া যাবে যখন পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, তদারকি বাড়াতে হবে। জুনিয়র অফিসাররা কী করছেন, তারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করছেন—তা সিনিয়রদের প্রতিনিয়ত মনিটর করতে হবে। কোনো থানাকে যদি সিন্ডিকেট বা নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর আখড়া বানানো হয়, তবে তার দায়ভার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরই নিতে হবে।
শনিবারের এই পরিদর্শনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন। তারা মন্ত্রীর নির্দেশনাসমূহ বাস্তবায়নে তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন। রমনা থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মন্ত্রীর সামনে থানা চত্বরকে দালালমুক্ত রাখার শপথ গ্রহণ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে থানা পর্যায়ের সেবা নিয়ে মানুষের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সরাসরি পরিদর্শন এবং দালালমুক্ত করার কঠোর নির্দেশ সেই আস্থাহীনতা দূর করার একটি প্রাথমিক কিন্তু শক্তিশালী পদক্ষেপ।
থানায় আসা এক সেবাগ্রহীতা গণমাধ্যমকে বলেন, “আগে থানায় ঢুকতেই ভয় লাগত। মনে হতো দালাল ছাড়া কোনো কাজ হবে না। যদি আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া এই নির্দেশনা সত্যি কার্যকর হয়, তবে সাধারণ মানুষ অনেক উপকৃত হবে।” মানুষের এই প্রত্যাশার কথা মন্ত্রীকে জানানো হলে তিনি বলেন, মানুষের আস্থার মর্যাদা রাখাই এই সরকারের মূল লক্ষ্য।
আলোচনা শেষে মন্ত্রী থানার ডায়েরি এবং রেকর্ড বুকসমূহ পর্যবেক্ষণ করেন। সেখানে মামলার তদন্তের অগ্রগতি এবং পেন্ডিং কেসগুলোর বিষয়ে তথ্য নেন। তিনি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, অহেতুক তদন্ত দীর্ঘায়িত করাও এক ধরনের হয়রানি।
সালাহউদ্দিন আহমদের এই ঝটিকা সফরের প্রভাব ইতিমধ্যেই ডিএমপির অন্যান্য থানাগুলোতে পড়তে শুরু করেছে। অনেক থানা থেকেই সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের প্রবেশ সহজতর করা হয়েছে। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক নির্দেশ নয়, বরং একটি নতুন শাসন ব্যবস্থার বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
দুপুরে যখন মন্ত্রী থানা চত্বর ত্যাগ করছিলেন, তখন পুলিশ সদস্যদের চোখেমুখে এক ধরনের নতুন উদ্দীপনা দেখা গেছে। একদিকে কঠোর শাস্তির ভয়, অন্যদিকে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির আশ্বাস—এই দ্বিমুখী কৌশলে পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর যে পরিকল্পনা সরকার নিয়েছে, তার সফল প্রতিফলনই আজ লক্ষ্য করা গেছে রমনা মডেল থানায়।
অবশেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুনরায় মনে করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশ এখন এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গকে কলুষমুক্ত হতে হবে। পুলিশ হবে মানুষের বন্ধু, ভয়ের কারণ নয়। আর সেই পথচলার শুরুটা হবে থানা থেকেই। আগামী দিনগুলোতে দেশের অন্যান্য প্রান্তেও দালালবিরোধী এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

