আকাশে ভোরের আলো ফোটার আগেই ঢাকার অলিগলিতে রিকশার টুংটাং শব্দ আর পোশাক শ্রমিকদের কারখানামুখী ব্যস্ততা মনে করিয়ে দেয় আজ পহেলা মে। ১৮৮৬ সালের শিকাগোর হে মার্কেটের সেই রক্তঝরা সংগ্রাম থেকে আজকের ২০২৬ সাল—সময় বদলেছে, মানচিত্র বদলেছে, কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের ঘাম ও ত্যাগের মহিমা অম্লান রয়ে গেছে। আজ মহান মে দিবস। বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও সংহতি প্রকাশের এই দিনটি গভীর শ্রদ্ধার সাথে পালিত হচ্ছে।
এ বছরের মে দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে—‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত, আসবে এবার নব প্রভাত’। এই স্লোগানটি কেবল একটি বাক্য নয়, বরং এটি বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিল্প ও শ্রম খাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখাকেই ইঙ্গিত করে। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং কর্মক্ষম হাতকে দক্ষ করে তোলার মাধ্যমেই যে একটি নতুন ভোরের সূচনা সম্ভব, সেই বার্তাই আজ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে দেশের প্রতিটি প্রান্তে।
মহান মে দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক পৃথক বাণীতে দেশের সকল শ্রমজীবী মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বাণীতে তারা শ্রমিকদের অবদানকে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেন। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে উঠে এসেছে একটি মানবিক ও ন্যায়নিষ্ঠ সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম এবং তাদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার বার্তায় আরও বলেন, শিল্প, কৃষি এবং নির্মাণ খাতসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন সাধারণ শ্রমিকরা। তাদের নিরলস পরিশ্রম ব্যতীত আজকের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের কল্পনা করা অসম্ভব। তিনি বিশ্বাস করেন, মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্ক এবং পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মে দিবস উপলক্ষে তার বক্তব্যে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সাথে সংগতি রেখে নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনা এবং নারী-পুরুষের সমান মজুরি নিশ্চিত করার বিষয়টি তার বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এটি এমন এক সময়ে এলো যখন বিশ্বব্যাপী শ্রম অধিকার নিয়ে নতুন করে আলাপ-আলোচনা চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর বাণীতে আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা। দেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাকে তিনি এই মে দিবসের অন্যতম উপহার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসী শ্রমিকরা এবং তাদের পরিবার রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও সুরক্ষা বলয়ের আওতায় আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আজকের দিনটির বিশেষ আকর্ষণ হতে যাচ্ছে রাজধানীর একটি শ্রমিক সমাবেশ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের আয়োজনে এই সমাবেশে প্রথমবারের মতো বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে শ্রমিকদের সমাবেশে সরাসরি উপস্থিত হওয়া এবং তাদের দাবি-দাওয়া শোনা একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। এই সংবাদটি নিশ্চিত করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
ইতিহাসের পাতায় ফিরে তাকালে দেখা যায়, আজকের এই ছুটির দিনটি বা আট ঘণ্টা কর্মদিবসের সুবিধাটি খুব সহজে আসেনি। ১৮৮৬ সালে শিকাগোর রাস্তায় যখন শ্রমিকরা ন্যায্য দাবির জন্য সমবেত হয়েছিলেন, তখন তাদের ওপর নেমে এসেছিল বর্বর পুলিশি নির্যাতন। পুলিশের গুলিতে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল মেহনতি মানুষের রক্তে। শিকাগোর সেই আত্মদানই মূলত পৃথিবীর শ্রম আইন ও মানবাধিকারের ভিত গড়ে দিয়েছিল।
শিকাগোর সেই হে মার্কেট স্কয়ারের শ্রমিকদের আত্মত্যাগ আজ কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং তা শোষণের বিরুদ্ধে চিরন্তন এক অনুপ্রেরণা। আজও বিশ্বের বহু দেশে শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বাংলাদেশেও শিল্প দুর্ঘটনা বা অনিয়মিত মজুরির খবর প্রায়ই শিরোনাম হয়। এই বাস্তবতায় মে দিবস পালন কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, শ্রমিকের জীবনের গুণগত পরিবর্তন আনাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনবল এবং সন্তুষ্ট শ্রমিক গোষ্ঠী। যদি কারখানার ভেতরে শ্রমিক অনিরাপদ বোধ করেন, তবে সেই উৎপাদন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। তাই মে দিবসের অঙ্গীকার হওয়া উচিত এমন এক কর্মপরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রতিটি শ্রমিক মর্যাদা ও সম্মানের সাথে কাজ করতে পারবেন। শ্রমিকের অধিকার রক্ষা করা কোনো দয়া নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা।
বর্তমান সরকারের ‘নব প্রভাত’ আনার যে পরিকল্পনা, তার কেন্দ্রে থাকতে হবে মেহনতি মানুষ। প্রযুক্তির এই যুগে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শ্রমিকদের কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তোলা এখন সময়ের দাবি। সস্তা শ্রমের দেশ হিসেবে পরিচিতি কাটিয়ে দক্ষ শ্রমের দেশ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পথেই রয়েছে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। আর এই পথযাত্রায় মালিক পক্ষকে আরও সহনশীল ও মানবিক হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে আজ লাল পতাকায় সজ্জিত শ্রমিক সংগঠনগুলোর মিছিল দেখা যাচ্ছে। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত রাজপথ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, অধিকার কেউ থালায় সাজিয়ে দেয় না, অধিকার আদায় করে নিতে হয়। তবে এই আদায়ের প্রক্রিয়ায় যাতে সংঘাত নয়, বরং আলোচনার টেবিল ও আইনি কাঠামোর প্রাধান্য থাকে, সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে সরকার ও নীতি-নির্ধারকদের।
মে দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি বহুতল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর থেকে শুরু করে সফটওয়্যার কোম্পানির কোডিং—সবই শ্রমের অংশ। বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম হোক বা শারীরিক শ্রম, মর্যাদার মানদণ্ড হওয়া উচিত অভিন্ন। যখন একজন শ্রমিক তার ন্যায্য মজুরি সময়মতো ঘরে নিয়ে যেতে পারেন, তখনই মে দিবসের প্রকৃত সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায়।
শেষ পর্যন্ত, মে দিবস হলো সেই মানবিক বোধের দিন, যা আমাদের শেখায় শ্রমের মূল্য দিতে। শিকাগোর শ্রমিকদের সেই বিপ্লব আজও প্রতিটি শ্রমিকের হৃদয়ে সাহসের সঞ্চার করে। ২০২৬ সালের এই মে দিবসে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—দেশের প্রতিটি কর্মক্ষেত্র হবে নিরাপদ, প্রতিটি শ্রমিক পাবেন তার ঘামের ন্যায্য দাম, আর উন্নয়ন হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক।
সুস্থ শ্রমিক এবং কর্মঠ হাতের মাধ্যমেই যে সমৃদ্ধির ‘নব প্রভাত’ আসবে, সেই লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার শপথ নেওয়ার দিন আজ। মে দিবসের এই চেতনা সারা বছর প্রতিটি কর্মস্থলে বেঁচে থাকুক—এটাই হোক আজকের প্রার্থনা। মহান মে দিবস দীর্ঘজীবী হোক। সকল শ্রমজীবী মানুষের জয় হোক।

