মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর শাহবাগে যখন শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবসের আলোচনা শুরু হলো, তখন মিলনায়তন জুড়ে ছিল এক নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা। প্রধান অতিথির আসনে বসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বিচারব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে তার সরকারের ভবিষ্যৎ দর্শনের কথা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, গণতান্ত্রিক যাত্রাকে যদি দীর্ঘস্থায়ী ও সুসংহত করতে হয়, তবে রাষ্ট্রে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে এই সভায় প্রধানমন্ত্রী এক আবেগঘন অথচ বলিষ্ঠ বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, দীর্ঘ দেড় দশকের একটি কঠিন রাজনৈতিক অধ্যায় বা ‘ফ্যাসিবাদী শাসনে’র অবসানের পর বাংলাদেশ এখন পুনরায় গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে শুরু করেছে। এই পথচলা তখনই সার্থক হবে, যখন দেশের প্রতিটি নাগরিক—সে ধনী হোক বা দরিদ্র—আইনের সমান আশ্রয় পাবে।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে ‘এক্সেস টু জাস্টিস’ বা বিচার পাওয়ার অধিকারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, একটি মানবিক রাষ্ট্রে বিচার কেবল আইনের বইয়ে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। অনেক সময় দেখা যায়, স্রেফ অর্থের অভাবে একজন মানুষ ভালো আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন না বা আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে পারেন না। তারেক রহমানের মতে, একজন ভুক্তভোগী টাকার অভাবে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন—এমনটা একটি গণতান্ত্রিক সমাজে কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সরকারের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ন্যায়বিচার কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, এটি একটি জীবন্ত মূল্যবোধ। এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রতিফলিত হতে হবে। তিনি মনে করেন, আইন কেবল মানুষের ওপর প্রয়োগ করার মাধ্যম হওয়া উচিত নয়, বরং এটি মানুষের মর্যাদা এবং অধিকার রক্ষার একটি নৈতিক অঙ্গীকার হওয়া প্রয়োজন। এই দর্শনকে সামনে রেখেই সরকার লিগ্যাল এইড বা আইনি সহায়তা কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নিজের কারাজীবনের অভিজ্ঞতার কথা টেনে এক মর্মস্পর্শী স্মৃতিচারণ করেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে কাটানোর সময় তিনি অনেক মানুষকে দেখেছেন, যারা কেবল আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে বছরের পর বছর বিনা বিচারে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি আজ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, অর্থের অভাবে ন্যায়বিচার বঞ্চিত হওয়ার গ্লানি একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দেয়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী কয়েকজনের হাতে সম্মাননা তুলে দেন। বিশেষ করে ঢাকার সায়েম খান এবং রাজশাহীর নীলিমা বিশ্বাস সেরা প্যানেল আইনজীবী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ক্রেস্ট গ্রহণ করেন। এছাড়াও বেসরকারি পর্যায়ে আইনি সুরক্ষায় অনন্য অবদানের জন্য ব্র্যাককে সম্মাননা প্রদান করা হয়। ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে এই স্বীকৃতি গ্রহণ করেন।
বর্তমান সময়ে মামলার জট কমাতে অল্টারনেটিভ ডিসপিউট রেজোলিউশন (ADR) বা আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘জাস্টিস ডিলেড ইজ জাস্টিস ডিনাই’—অর্থাৎ বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই বিচারকে অস্বীকার করা। লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে এখন হাজার হাজার বিরোধ আদালতের বাইরেই মিটিয়ে ফেলা সম্ভব হচ্ছে। এতে যেমন বিচারপ্রার্থীর হয়রানি কমছে, তেমনি আদালতের ওপর থেকেও বাড়তি চাপ কমছে।
প্রধানমন্ত্রী সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ছোটখাটো বিবাদ যেন জটিল রূপ না নেয়, সেজন্য তারা যেন শুরুতেই আইনি পরামর্শ গ্রহণ করেন। এ ক্ষেত্রে সরকারি লিগ্যাল এইড হেল্পলাইনকে আরও কার্যকর করার নির্দেশ দেন তিনি। একজন নাগরিক হিসেবে তিনি আশা করেন, এই হেল্পলাইন মানুষের দোরগোড়ায় ন্যায়বিচার পৌঁছে দিতে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে।
বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসের দিকে আলোকপাত করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরিয়ে এনেছিলেন। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া লিগ্যাল এইড ফার্ম গঠন করে সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার পথ সুগম করেছিলেন। সেই উত্তরাধিকারকে ধারণ করেই বর্তমান সরকার এক বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে এই অনুষ্ঠানটি শেষ হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য দেশের বিচারিক অঙ্গনে একটি নতুন আশার সঞ্চার করেছে, যেখানে আইনের শাসন কেবল শক্তিশালী নয়, বরং সাধারণের জন্য সহজলভ্য হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

