তপ্ত রোদের তীব্রতা আর গ্রীষ্মের ঘাম উপেক্ষা করে রাজপথের দখল নিয়েছেন হাজারো শিক্ষক পদপ্রার্থী। ‘দাবি মোদের একটাই, নিয়োগপত্র হাতে চাই’—এমন জোরালো স্লোগানে আজ প্রকম্পিত হয়ে উঠেছে রাজধানীর শাহবাগ চত্বর। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও আড়াই মাসে নিয়োগপত্র না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে রাজপথে নেমেছেন তারা।
রোববার বেলা ১১টা থেকে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে শুরু হওয়া এই অবস্থান কর্মসূচিতে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জনসমাগম। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এই হবু শিক্ষকদের একটাই পণ—নিয়োগপত্র হাতে না নিয়ে তারা কর্মস্থল বা বাড়িতে ফিরবেন না। কেউ মাথায় ছাতা ধরে, কেউবা প্লাকার্ড উঁচিয়ে নিজের অধিকারের দাবি জানাচ্ছেন। শাহবাগের মোড়ে মোড়ে এখন একটাই প্রতিধ্বনি, ‘তুমি কে? আমি কে? শিক্ষক, শিক্ষক!’
আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ৮ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল। প্রায় ১১ লাখ প্রতিযোগীর সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হন। নিয়ম অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ডোপ টেস্টের রিপোর্টসহ সব নথিপত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে প্রায় আড়াই মাস আগে। কিন্তু এরপর থেকেই এক রহস্যময় নীরবতা পালন করছে কর্তৃপক্ষ।
সুমি নামে একজন নিয়োগপ্রত্যাশী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা মেধার স্বাক্ষর রেখে নির্বাচিত হয়েছি। আড়াই মাস ধরে আমাদের ঘোরানো হচ্ছে। আমাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া কেন ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে? গত সরকার না বর্তমান সরকার—কার আমলে পরীক্ষা হয়েছে সেটি আমাদের দেখার বিষয় নয়। আমরা চাই আমাদের পরিশ্রমের স্বীকৃতি। আজ নিয়োগের স্পষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আমরা শাহবাগেই খাব, এখানেই ঘুমাব।”
আন্দোলনরতদের অভিযোগ, গত ২২ এপ্রিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর একটি বক্তব্য তাদের মধ্যে চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে। তারা আশঙ্কা করছেন, একটি মহল এই স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত করে পুনরায় নিয়োগের পাঁয়তারা করছে। ইতিমধ্যে অনেকে সরকারি চাকরির আশায় আগের বেসরকারি কর্মসংস্থান ছেড়ে দিয়ে এখন মানবেতর জীবন যাপন করছেন। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে তারা এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে।
এর আগে গত ২৩ এপ্রিল সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সরকারকে ১০ দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন প্রার্থীরা। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় তারা রাজপথে নামার সিদ্ধান্ত নেন। আন্দোলনকারী নেতারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ১ মার্চের মধ্যে সব সনদ যাচাই ও পরিচিতি পর্ব শেষ হওয়ার পরও নিয়োগপত্র না দেওয়াটা কর্তৃপক্ষের ‘প্রহসন’ ছাড়া আর কিছুই নয়।
দুপুরের পর শাহবাগের এই জমায়েত আরও বড় হতে শুরু করে। আন্দোলনকারীদের অবস্থানের কারণে আশপাশের রাস্তায় যানচলাচল ধীর হয়ে পড়েছে, যা জনজীবনে কিছুটা প্রভাব ফেললেও চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে পিছু হটার কোনো লক্ষণ নেই। পুলিশের উপস্থিতিতে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ থাকলেও ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি যেকোনো সময় ফেটে পড়তে পারে বলে মনে করছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
বিকেল নাগাদ নীতিনির্ধারক মহলের পক্ষ থেকে কোনো আশ্বাস না আসায় আন্দোলনকারীরা শাহবাগ মোড়েই অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের দাবি, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজই নিয়োগের চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা করতে হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য এখনো পাওয়া না গেলেও, শাহবাগের এই ‘শিক্ষক বিদ্রোহ’ এখন রাজধানীর অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

