দেশে হামের প্রাদুর্ভাব জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে শুরু করেছে। গত দেড় মাসে হাম এবং হাম সদৃশ উপসর্গ নিয়ে সারা দেশে অন্তত ২৫১টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ৪২ শিশুর শরীরে নিশ্চিতভাবে হামের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। বাকি ২০৯ জন মারা গেছে হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে।
শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিনে এই আশঙ্কাজনক তথ্য জানানো হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, যা বর্তমানে ৩০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে ল্যাবে নিশ্চিত হওয়া হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ৪ হাজার ৪৬০। তবে উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুর সংখ্যা অনেক বেশি—প্রায় ৩০ হাজার ৬০৭ জন। অর্থাৎ, প্রতিদিন শত শত শিশু জ্বর ও শরীরে লালচে দানার মতো উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভিড় করছে।
ভৌগোলিক দিক থেকে বিচার করলে ঢাকা বিভাগের অবস্থা এখন সবচেয়ে শোচনীয়। সারা দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই ঘটেছে এই বিভাগে। তথ্যানুসারে, ঢাকা বিভাগে হাম ও হাম সন্দেহে ১২৪ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা ১৬ হাজার ৭১০ জন। বড় শহরগুলোর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত ২৪ ঘণ্টা বা একদিনের চিত্রটিও বেশ উদ্বেগজনক। মাত্র ২০ ঘণ্টায় সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই এক দিনেই নতুন করে আক্রান্ত বা লক্ষণযুক্ত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৮৭ জনে। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে এখন ঠাঁই নেই অবস্থা।
চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ যা মূলত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায়। সঠিক সময়ে টিকা না নেওয়া বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগ প্রাণঘাতী হতে পারে। বিশেষ করে পুষ্টিহীনতায় ভোগা শিশুদের নিউমোনিয়া বা মস্তিষ্কের সংক্রমণের মতো জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক বছরে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে কোনো ধরনের ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহুরে বস্তি এলাকায় সংক্রমণের হার বেশি হওয়ায় সেখানে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
হাসপাতালগুলোতে হামের রোগীদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ডের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ওয়ার্ডে অন্য রোগীদের সাথে রাখার ফলে সুস্থ শিশুরাও সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অবশ্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
মা-বাবার প্রতি চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো—শিশুর উচ্চ তাপমাত্রার জ্বর, সর্দি-কাশি এবং শরীরে র্যাশ বা দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার দেওয়ার পাশাপাশি শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখাই এখন প্রধান প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
আগামী কয়েক সপ্তাহ হামের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। টিকাদান কাভারেজ বাড়াতে সারা দেশে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরুর কথা ভাবছে প্রশাসন।
সংকটের এই মুহূর্তে জনসচেতনতাই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। প্রতিটি শিশুর টিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আক্রান্তদের সঠিক যত্ন নেওয়া গেলে মৃত্যুহার কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা না থাকায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

