দেশের বিচার বিভাগের সুউচ্চ মর্যাদা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় এক কঠোর ও নজিরবিহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন প্রধান বিচারপতি। কুমিল্লায় একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে অপেশাদার ও অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি আব্দুল মান্নানকে বিচারিক কাজ থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের উচ্চপদস্থ একাধিক সূত্র বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করেছে যে, প্রধান বিচারপতির সাম্প্রতিক নেওয়া এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে। নবগঠিত ৬৩টি হাইকোর্ট বেঞ্চের তালিকায় বিচারপতি আব্দুল মান্নানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অর্থাৎ, তিনি বর্তমানে কোনো বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না।
এই ঘটনার সূত্রপাত গত ৩ এপ্রিল, যখন কুমিল্লার এপেক্স ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি আব্দুল মান্নান। সেখানে তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে তিনি আয়োজক ও উপস্থিত ব্যক্তিদের সাথে চরম বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। অভিযোগ ওঠে, তিনি নিজের পদের প্রভাব খাটিয়ে উপস্থিত সাধারণ মানুষকে হুমকি প্রদান করেন।
ঘটনাটি কেবল মৌখিক অভিযোগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ওই মুহূর্তের কিছু ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে একজন বিচারপতির এমন রুক্ষ এবং আক্রমণাত্মক আচরণ দেখে সাধারণ মানুষ ও আইন অঙ্গনের কর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। একজন উচ্চপদস্থ বিচারকের কাছ থেকে এমন আচরণ অপ্রত্যাশিত বলে অনেকেই মন্তব্য করেন।
সাধারণত বিচারকদের আচরণ বিধি অত্যন্ত কঠোর এবং পরিশীলিত হওয়ার কথা। বিচারিক পদের সম্মান ও পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থেই প্রধান বিচারপতি তাকে বেঞ্চ থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের একটি অংশ মনে করছে, এটি বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি রক্ষার একটি সাহসী পদক্ষেপ।
বিচারপতি মো. আব্দুল মান্নান ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। উচ্চ আদালতে যোগদানের আগে তিনি পিরোজপুর জেলার জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ বিচারিক ক্যারিয়ার থাকলেও কুমিল্লার ওই একটি ঘটনা তার পেশাগত অবস্থানে বড় ধরনের ছেদ ঘটালো।
বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগে এমন ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুব বেশি নেই। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারকদের ব্যক্তিগত জীবনেও সংযম পালন করা বাধ্যতামূলক। কারণ তাদের প্রতিটি কথা ও কাজ বিচারালয়ের নিরপেক্ষতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
বৃহস্পতিবার সকালে সুপ্রিম কোর্টের দৈনন্দিন কার্যতালিকা বা ‘কজ লিস্ট’ প্রকাশের পর বিষয়টি সবার নজরে আসে। সেখানে দেখা যায়, অন্য সব বিচারপতির জন্য নির্দিষ্ট বেঞ্চ বরাদ্দ থাকলেও মান্নানের নাম কোথাও নেই। আইন অঙ্গনে দিনভর এটিই ছিল প্রধান আলোচনার বিষয়।
বিচারপতি আব্দুল মান্নানের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো অবশ্য এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে যে, বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত বা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পর্যায়ে কোনো শুনানি হবে কি না। বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রধান বিচারপতির এই জিরো টলারেন্স নীতিকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন কনিষ্ঠ আইনজীবীরা।
একজন বিচারপতির ক্ষমতা কেবল এজলাসের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, সমাজের চোখে তিনি ন্যায়ের প্রতীক। কুমিল্লার সেই ভিডিওতে দেখা যাওয়া দৃশ্যগুলো সেই প্রতীকের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল বলে মনে করছেন সিনিয়র আইনজীবীরা। ফলে, বিচার বিভাগের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।
বর্তমানে তাকে কোনো কাজ না দিয়ে ‘অ্যাটাচড’ রাখা হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে দাপ্তরিকভাবে তাকে কেবল ‘বিচারকাজ থেকে বিরত রাখা হয়েছে’ বলেই উল্লেখ করা হচ্ছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই আদেশ বহাল থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা বজায় রাখার জন্য এমন দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা জরুরি ছিল। বিচারক হওয়ার অর্থ এই নয় যে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে বা সাধারণ মানুষের সাথে অপেশাদার আচরণের লাইসেন্স পেয়েছেন। এই বার্তাটিই আজ সুপ্রিম কোর্ট থেকে পরিষ্কারভাবে দেওয়া হলো।
এই ঘটনার ফলে নবীন বিচারকদের জন্যও একটি শক্তিশালী বার্তা পৌঁছালো। পদের গরিমা এবং ব্যক্তিগত আচরণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বিচারপতি মান্নানের এই পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট। ক্ষমতার দম্ভ নয়, বরং বিনয় ও ন্যায়পরায়ণতাই বিচারকের প্রধান অলঙ্কার হওয়া উচিত।
আজকের এই প্রশাসনিক পদক্ষেপটি বিচার বিভাগের ইতিহাসে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার এক নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আইন ও বিচার বিভাগ এখন বিচারপতি মান্নানের বিষয়ে পরবর্তী কী স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে সারা দেশ।

