মধ্যরাত থেকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল—ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে, কিন্তু গাড়ির চাকা সরছে না। জ্বালানি তেলের জন্য রাজধানীর প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে এখন এক অন্তহীন অপেক্ষার চিত্র। ব্যক্তিগত গাড়ির চালক শিপুল রাত ২টায় লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন একটু তেলের আশায়। সারারাত গাড়িতেই ঘুমিয়েছেন, খাওয়া-দাওয়াও সেখানেই। বুধবার দুপুরে যখন তার গাড়িটি পাম্পের মুখে পৌঁছাল, ততক্ষণে পার হয়ে গেছে দীর্ঘ ১২টি ঘণ্টা। শিপুলের প্রশ্ন, “তেলের জন্য ১২ ঘণ্টা রাস্তার ওপর বসে থাকা কি কোনো মানুষের কাজ?”
শিপুলের মতো হাজারো মানুষের এই দীর্ঘশ্বাস এখন ঢাকার রাজপথে রাজপথের চিরচেনা দৃশ্য। তেজগাঁও লিংক রোডের শিকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে শিপুল আক্ষেপ করে বলছিলেন, “এখন তেলের জন্য অপেক্ষা করাটাও আমাদের ডিউটির অংশ হয়ে গেছে। অথচ এই ১২ ঘণ্টায় পৃথিবীতে কত প্রয়োজনীয় কাজ করা সম্ভব ছিল।” রাজধানীর বেশিরভাগ পাম্পের সামনেই এখন কয়েকশ গাড়ির দীর্ঘ সারি, যা কোথাও কোথাও এক কিলোমিটার পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বুধবার দুপুর পর্যন্ত শহরের অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনেই ঝুলছিল ‘তেল নেই’ লেখা বোর্ড। ডিআইটি রোডের হাজীপাড়া ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, ডিজেল ও অকটেন না থাকায় পাম্প কর্মীরা অলস সময় পার করছেন। তারা জানালেন, ডিপো থেকে তেলের লরি না আসলে সন্ধ্যা ৬টার আগে বিক্রি শুরু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবুও পাম্পের বাইরে গাড়ির লাইন ৩০০ মিটার ছাড়িয়ে গেছে—যদি তেলের দেখা মেলে, এই আশায়।
তেজগাঁওয়ের আইডিয়াল ফিলিং স্টেশনের চিত্র আরও করুণ। পাম্পের প্রবেশপথে শিকল দিয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাইনবোর্ডে লেখা—‘অকটেন ও ডিজেল ডিপো থেকে আসলে দেওয়া হবে’। তেলের অপেক্ষায় থাকা গাড়ির সারি এখান থেকে শুরু হয়ে হাতিরঝিলের ভেতর পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। হাতিরঝিল মোড়ে লাইনে থাকা চালক সেলিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, “মন্ত্রীরা সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন দেশে তেলের অভাব নেই, অথচ আমাদের দিনরাত রাস্তায় পড়ে থাকতে হয়। তাদের কথাই মিথ্যা, নাকি আমাদের এই ভোগান্তি মিথ্যা—সেটা কে বিচার করবে?”
তেল সংকটের এই হাহাকারের মধ্যেও কিছু কিছু পাম্পে সীমিত আকারে বিক্রি চলছিল। তবে সেখানে ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। নাবিস্কো রোড থেকে শুরু করে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ এভিনিউ পর্যন্ত সবখানেই গাড়ির জটলা। এর ফলে মূল সড়কে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট, যার প্রভাব পড়ছে অফিসগামী সাধারণ মানুষের ওপর। তেলের দাম বাড়লেও জোগানের এই অনিশ্চয়তা পরিবহন খাতের অস্থিরতাকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
অথচ সরকারের দেওয়া পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। গত ১৫ এপ্রিল জ্বালানি বিভাগ থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ১ হাজার ৩৮৫ মেট্রিক টন ডিজেল মজুত আছে। এছাড়া ৩১ হাজার ৮২১ মেট্রিক টন অকটেন এবং ১৮ হাজার ২১১ মেট্রিক টন পেট্রোলসহ ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েলের পর্যাপ্ত মজুত থাকার দাবি করা হয়েছে। সরকারি খাতায় মজুত থাকলেও পাম্পে কেন তেল মিলছে না, সেই রহস্যের জট খুলছে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের কোনো ত্রুটি বা আমদানিতে ডলার সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এই খাতে। আবার অনেক পাম্প মালিক দাম আরও বাড়ার আশায় তেল মজুত করে রাখছেন কি না, সেই প্রশ্নও তুলছেন অনেকে। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যখন তুঙ্গে, তখন মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনের তদারকি ও তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি এখন শহরজুড়ে। ঢাকার রাজপথে শিপুল বা সেলিমের মতো মানুষদের এই ‘অমানবিক’ অপেক্ষা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

