দেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া হামের প্রকোপ থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় এই সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে আরও ৫টি নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ ঝরেছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৩৫৮ জন। বুধবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই উদ্বেগজনক তথ্য জানানো হয়েছে।
চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে মোট ১২৮ জন শিশুর মৃত্যু হলো। এর মধ্যে গত ১৫ মার্চ থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৩৮ জন শিশু। বাকি ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, আক্রান্তের হার গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার অনেক বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত দেড় মাসে সারাদেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৩ হাজার ৯৩৪ জন। তবে এর বাইরেও ২৭ হাজার ১৬৪ জন শিশুর শরীরে হামের লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা গেছে। এই বিশাল সংখ্যক অসুস্থ শিশুর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো। বিশেষ করে দুর্গম এলাকা এবং শহরের বস্তি অঞ্চলগুলোতে এই রোগের বিস্তার সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ যা মূলত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায়। শিশুদের সময়মতো এমআর (হাম ও রুবেলা) টিকা না দেওয়াই এই প্রাদুর্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ছয় মাসের একটি বিশেষ জরুরি কর্মসূচি শুরু করেছে। দুর্গম এলাকায় টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করাই এখন তাদের মূল লক্ষ্য।
এদিকে, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল দশা নিয়ে সরকারের ভেতরেই সমালোচনার সুর শোনা যাচ্ছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী নিজেই এক অনুষ্ঠানে স্বীকার করেছেন যে, দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও ভুল পরিকল্পনার কারণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। হামের মতো একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ কেন এভাবে প্রাণঘাতী হয়ে উঠল, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অভিভাবক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের জ্বর, সর্দি-কাশি এবং শরীরে লালচে দানাদার র্যাশ দেখা দিলেই দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পর্যাপ্ত তরল খাবার এবং ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবারের পাশাপাশি শিশুকে আলাদা রাখা জরুরি যাতে সংক্রমণ আর না ছড়ায়। বিশেষ করে টিকার ঘাটতি রয়েছে এমন এলাকায় দ্রুত ক্যাম্পেইন চালানোর দাবি তুলেছেন নাগরিক সমাজ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের প্রতিটি জেলায় বর্তমানে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে আক্রান্তের যে ঊর্ধ্বগতি, তা সামাল দিতে সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই মরণঘাতী হামের হাত থেকে শিশুদের বাঁচাতে টিকার বিকল্প নেই—এই বার্তা এখন দেশের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

