দরজায় কড়া নাড়ছে বৈশাখী ধান কাটার উৎসব, আর ঠিক এই সময়েই কৃষকের মুখের হাসি চওড়া করতে বড় ঘোষণা দিল সরকার। আগামী ৩ মে থেকে দেশজুড়ে শুরু হতে যাচ্ছে চলতি বোরো মৌসুমের ধান, চাল ও গম সংগ্রহের মহাযজ্ঞ। সরকারের লক্ষ্য এবার ১৮ লাখ মেট্রিক টন ধান-চাল এবং ৫০ হাজার মেট্রিক টন গম নিজেদের গুদামে তোলা, যা চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।
বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সভায় উপস্থিত ছিলেন খাদ্য প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারীসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। মূলত দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের ফসলের ন্যায্য দাম দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ বছর সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে প্রতি কেজি বোরো ধান কিনবে ৩৬ টাকা দরে। এছাড়া মিলারদের কাছ থেকে প্রতি কেজি সিদ্ধ চাল ৪৯ টাকা এবং আতপ চাল ৪৮ টাকা দরে সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রুটির এই দেশে গমের চাহিদা বিবেচনায় রেখে প্রতি কেজি গম ৩৬ টাকা দরে কেনার ঘোষণা দিয়েছেন মন্ত্রী। গত বছরের তুলনায় দরে কিছুটা সমন্বয় করা হয়েছে যাতে উৎপাদন খরচের সাথে সামঞ্জস্য বজায় থাকে।
তথ্যমতে, এবার ৫ লাখ টন ধান, ১২ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং ১ লাখ টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। তবে সংগ্রহ শুরুর দিনক্ষণে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। ধান ও গম সংগ্রহের কাজ ৩ মে থেকে শুরু হলেও চাল কেনা শুরু হবে মে মাসের মাঝামাঝি অর্থাৎ ১৫ মে থেকে। সরকারের এই উদ্যোগের ফলে স্থানীয় বাজারে চালের দাম স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক আশ্বস্তকারী তথ্য দিয়ে বলেন, “আমাদের সরকারি গুদামে বর্তমানে ১৭ থেকে ১৮ লাখ মেট্রিক টন চাল মজুত আছে। অর্থাৎ দেশে খাদ্যের কোনো সংকট নেই, বরং পর্যাপ্ত মজুত দিয়েই আমরা নতুন মৌসুম শুরু করছি।” আপদকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই বিশাল মজুত বড় ধরণের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করেন তিনি।
দেশের গমের বাজারের চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে বছরে গমের মোট চাহিদা প্রায় ৮০ লাখ টন। এর বিপরীতে দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৭০ থেকে ৭২ লাখ টন। অর্থাৎ বছরে আরও প্রায় ৮ লাখ টন গমের ঘাটতি থেকে যায়। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ‘জি টু জি’ (সরকার টু সরকার) পদ্ধতিতে গম আমদানির প্রক্রিয়া সচল রেখেছে।
তবে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে সরকারের এই নির্ধারিত দামকে স্বাগত জানালেও কেউ কেউ বলছেন, বাজারে সার ও সেচের খরচ যে হারে বেড়েছে, তাতে ৩৬ টাকা কেজি দরে ধান বিক্রি করে খুব একটা লাভ থাকবে না। প্রান্তিক কৃষকরা যাতে সিন্ডিকেটের খপ্পরে না পড়ে সরাসরি সরকারি গুদামে ধান দিতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের বড় চ্যালেঞ্জ।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এই ঘোষণার পর জেলা পর্যায়ে সংগ্রহের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দীর্ঘ এই সংগ্রহ অভিযানে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ডিজিটাল অ্যাপ এবং লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচনের প্রক্রিয়া জোরালো করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এই ১৮ লাখ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহের মাধ্যমে সরকার বাজারের অস্থিরতা কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।

