দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জননিরাপত্তা নিয়ে এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তার মতে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে ‘মব’ বা গণপিটুনির মতো বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডকে ভীষণভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে সমাজের একটি স্তরে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এক বিপজ্জনক মানসিকতা শিকড় গেড়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বুধবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ডা. জাহেদ বর্তমান সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, বর্তমান প্রশাসন এ ধরনের অরাজকতা মোকাবিলায় ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করেছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং কাউকেই রাস্তায় বিচার করার অনুমতি দেওয়া হবে না।
উপদেষ্টা ডা. জাহেদ বলেন, কোনো অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার একক এখতিয়ার কেবল রাষ্ট্রের। কোনো সাধারণ নাগরিক বা জনতা কাউকে সাজা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অতীতে এই অপসংস্কৃতিকে লালন করার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন এক ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে যে, চাইলেই কাউকে তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়া সম্ভব। এই সংস্কৃতি থেকে সমাজকে বের করে আনা এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি আরও বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি গুরুতর অপরাধীও হয়, তবুও তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করা বা পিটিয়ে মারা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হলে নাগরিকদের নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। প্রশাসনের কোনো স্তরে গাফিলতি থাকলে সরকার তা সংশোধনে কাজ করছে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে সাধারণ মানুষ আইন হাতে নেবে।
মব জাস্টিসের এই প্রবণতা বন্ধে ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, পরিকল্পিত বা সংগঠিত যে কোনো সহিংসতা কঠোর হাতে দমন করা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং একটি স্থিতিশীল সমাজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।
ডা. জাহেদের এই মন্তব্য রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করায় অনেকেই একে গত কয়েক বছরের প্রশাসনিক শিথিলতার বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের এক কঠোর বার্তা হিসেবে দেখছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হবে ঠিকই, কিন্তু তা হবে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, গণআক্রোশের মাধ্যমে নয়।
উপদেষ্টা তার বক্তব্যের শেষে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন কোনো অভিযোগ বা অপরাধের ক্ষেত্রে আবেগপ্রবণ হয়ে কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি না করেন। বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন। একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ‘রাস্তার বিচার’ কখনোই টেকসই সমাধান হতে পারে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

