একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কেবল প্রচলিত যুদ্ধকৌশল নয়, বরং প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসমৃদ্ধ একটি ‘স্মার্ট’ সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলাই বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার। বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রতিরক্ষা খাত নিয়ে এই ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরেন।
সংসদ সদস্য আলফারুক আব্দুল লতীফের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার সশস্ত্র বাহিনীকে একটি দক্ষ, আধুনিক এবং সময়োপযোগী শক্তিতে রূপান্তর করতে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি ‘বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধক্ষমতা’ বা ক্রেডিবল ডিটারেন্স তৈরি করাই তার প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে একটি নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল ও আধুনিক প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে স্পষ্ট করেন যে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র এখন আর কেবল স্থল, জল বা আকাশে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমানের নিরাপত্তা বাস্তবতায় সাইবার স্পেস, তথ্যযুদ্ধ এবং ড্রোন প্রযুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। তাই সরকার প্রচলিত সমরাস্ত্রের পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং উপকূলীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশেষ জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে বিমান বাহিনীর শক্তি বাড়াতে ৪.৫ প্রজন্মের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সংযোজনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা খাতে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ উদ্যোগের আওতায় দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলা হবে। এতে করে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমে আসবে এবং দেশের সামরিক সক্ষমতা আরও দৃঢ় হবে। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনীকে রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে একটি পেশাদার, জনআস্থাসম্পন্ন ও সমন্বিত বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, সমুদ্রপথের সুরক্ষা এবং ব্লু ইকোনমির বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নৌবাহিনীকে আরও আধুনিক নৌযান ও সাবমেরিন দিয়ে সজ্জিত করা হচ্ছে। একইভাবে বিমান বাহিনীর নজরদারি ও দ্রুত মোতায়েন সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আকাশসীমার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধিও এই মহাপরিকল্পনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের পেশাগত মানোন্নয়ন ও কল্যাণেও সরকার সংবেদনশীল। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, উন্নত প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিমুখী শিক্ষার পাশাপাশি সদস্যদের অবসরোত্তর মর্যাদা এবং ‘এক পদ, এক পেনশন’-এর মতো বিষয়গুলো সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। একটি জ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক বাহিনী গড়তে এটি হবে এক বড় বিনিয়োগ।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে তারেক রহমান বলেন, বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ প্রশিক্ষণ ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার করা হচ্ছে। নিয়মিত প্রতিরক্ষা সংলাপ এবং স্টাফ পর্যায়ের বৈঠকের মাধ্যমে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়।
সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য দেশের প্রতিরক্ষা খাতে এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের সাথে দেশীয় প্রযুক্তির সমন্বয় এবং সাইবার সক্ষমতা বৃদ্ধির এই পদক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। সার্বভৌমত্ব রক্ষার এই লড়াইয়ে প্রযুক্তি ও পেশাদারিত্বই হবে আগামীর মূল চাবিকাঠি।

