রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ততম মোড় মহাখালী এখন এক বিশাল স্থবির জনপদে পরিণত হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যা সাতটা থেকে শুরু হওয়া তীব্র যানজটে স্থবির হয়ে পড়েছে আমতলী থেকে সাতরাস্তা পর্যন্ত পুরো এলাকা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও গাড়ির চাকা না নড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজার হাজার ঘরমুখী মানুষ। রাত পৌনে দশটা বাজলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি লক্ষ্য করা যায়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, মহাখালী ফ্লাইওভারের নিচ থেকে শুরু করে জাহাঙ্গীর গেট, গুলশান এবং সাতরাস্তা অভিমুখী প্রতিটি সড়কেই যানবাহনের মাইলের পর মাইল দীর্ঘ সারি। বাস, প্রাইভেটকার এবং সিএনজি চালিত অটোরিকশাগুলো একই জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দীর্ঘক্ষণ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ধৈর্য হারিয়ে অনেক যাত্রীকে বাস থেকে নেমে হেঁটেই গন্তব্যের দিকে রওনা হতে দেখা গেছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ভোগান্তি ছিল অবর্ণনীয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই যানজট নিয়ে ক্ষোভ আছড়ে পড়ছে। বিভিন্ন ট্রাফিক অ্যালার্ট গ্রুপে যাত্রীরা তাদের আটকা পড়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন। মেরাজ হোসেন রুম্মান নামে এক ভুক্তভোগী প্রশ্ন তুলেছেন, “মহাখালীর এই যানজট থেকে আমাদের রক্ষা করবে কে?” মেহেরুন আক্তার নামে অন্য এক যাত্রী জানান, আমতলী থেকে গুলশান যেতেই তার এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে, যা স্বাভাবিক সময়ে মাত্র কয়েক মিনিটের পথ।
হঠাৎ এই ভয়াবহ যানজটের পেছনে দুটি প্রধান কারণ খুঁজে পেয়েছে ট্রাফিক পুলিশ। প্রথমত, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে কড়াইল বস্তির কয়েকশ বাসিন্দা মহাখালী ওয়ারলেস এলাকায় রাস্তা অবরোধ করেন। তাদের অভিযোগ, কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বস্তির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩০ মিনিট স্থায়ী এই অবরোধে সড়কের সব দিকের যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। যদিও পুলিশ বুঝিয়ে তাদের সরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু সেই আধা ঘণ্টার প্রভাব পুরো এলাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাকে ধসিয়ে দিয়েছে।
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জ্বালানি সংকটের প্রভাব। মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সংলগ্ন পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি নেওয়ার জন্য কয়েকশ বাসের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। এই সারি মূল সড়কের অনেকটা অংশ দখল করে রাখায় যানবাহন চলাচলের জায়গা সরু হয়ে গেছে। বিশেষ করে আন্তঃজেলা বাসগুলো পাম্পে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকায় মহাখালী থেকে সাতরাস্তা অভিমুখী রাস্তায় তিল ধারণের জায়গা নেই।
চালকরা জানিয়েছেন, এমনিতেই সোমবার সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসে যানবাহনের চাপ বেশি থাকে, তার ওপর রাস্তার মাঝখানে অবরোধ এবং তেলের পাম্পের জট পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে গেছে। আমতলী মোড়ে দায়িত্বরত এক ট্রাফিক সদস্য জানান, “পিক আওয়ারে এক মিনিট রাস্তা বন্ধ থাকলে তার প্রভাব পড়ে পরবর্তী দুই ঘণ্টা। সেখানে আধা ঘণ্টা রাস্তা বন্ধ থাকা মানে পুরো চেইন ভেঙে পড়া।”
ডিএমপির ট্রাফিক গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “কড়াইল বস্তিবাসীদের আকস্মিক অবরোধই মূলত এই যানজটের সূত্রপাত ঘটিয়েছে। বর্তমানে পুলিশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে পাম্পগুলোতে তেলের জন্য গাড়ির লাইন দীর্ঘ হওয়ায় যানচলাচলের গতি স্বাভাবিক হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।”
মহাখালীর এই যানজটের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতেও। বনানী, বিজয় সরণি এবং মগবাজার এলাকার ট্রাফিক সিগন্যালগুলোতেও যানবাহনের বাড়তি চাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাত বাড়ার সাথে সাথে যানজট কিছুটা কমবে বলে আশা করা হলেও, জ্বালানি নিতে আসা বাসগুলোর দীর্ঘ লাইন রাতের ট্রাফিক ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অফিস ফেরত মানুষেরা বলছেন, ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ছোট কোনো বিচ্যুতিও যে কত বড় ভোগান্তির কারণ হতে পারে, আজকের মহাখালী তার জ্বলন্ত উদাহরণ।

