বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীকে কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক হীনস্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী বা বিমানবাহিনী কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের এক অমূল্য সম্পদ এবং জনগণের আস্থার শেষ আশ্রয়স্থল।
রোববার সকালে ঢাকা সেনানিবাসে আয়োজিত সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ‘দরবার’-এ দেওয়া এক দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই সমাবেশকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
পেশাদারিত্বে আপসহীন হওয়ার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের দেশপ্রেম এবং পেশাদারিত্বের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, একটি আধুনিক ও সুশৃঙ্খল বাহিনীর মূল শক্তি হলো তার পেশাদারিত্ব। কোনো প্রকার প্রলোভন বা রাজনৈতিক চাপে এই পেশাদারিত্বের যেন অবক্ষয় না ঘটে, সে বিষয়ে সদস্যদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
“আপনারা দেশের সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী,” উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার সশস্ত্র বাহিনীকে বিশ্বমানের এবং আরও শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে সব ধরনের সহায়তা প্রদানে বদ্ধপরিকর। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি।
২০২৪-এর ভূমিকা ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা
বক্তব্যের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ৫ আগস্ট পরবর্তী উত্তাল দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ওই সময় দেশে যখন দৃশ্যমান প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তখন সশস্ত্র বাহিনী যে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে, তা স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণকে আশান্বিত করেছে।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের কঠিনতম সময়ে আপনারা জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অস্থিরতা কাটিয়ে শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতে আপনাদের অবদান জাতি চিরকাল কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ রাখবে।”
পিলখানা হত্যাকাণ্ড ও হারানো মর্যাদা উদ্ধার
সেনাবাহিনীর ওপর অতীতের আঘাতগুলো নিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল কথা বলেন তারেক রহমান। বিশেষ করে ২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডি প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ওই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে আমাদের গর্বিত সেনাবাহিনীকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন যে, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা কুশীলবদের খুঁজে বের করে উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করতে তার সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি অভিযোগ করেন যে, বিগত দেড় দশকের শাসনকালে সশস্ত্র বাহিনীকে দলীয়করণ ও বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে, যা বাহিনীর চেইন অফ কমান্ডের ক্ষতি করেছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও আধুনিকায়ন
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর মতো দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার আধুনিক সংস্করণের ইঙ্গিত দেন। তিনি জানান, বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের আবাসন, রেশন এবং উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করা হবে, যাতে তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে দেশের সেবায় মনোনিবেশ করতে পারেন।
সবশেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সশস্ত্র বাহিনীর সম্মান মানেই বাংলাদেশের সম্মান। আমরা এমন একটি ব্যবস্থা গড়তে চাই যেখানে কেউ আর এই বাহিনীকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সাহস পাবে না।”
ঢাকা সেনানিবাসের এই অনুষ্ঠানে সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা ও আস্থার সঞ্চার করবে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।

