রংপুরের শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার ঐতিহাসিক রায়ের রেশ কাটতে না কাটতেই এক নজিরবিহীন উত্তেজনার সাক্ষী হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বৃহস্পতিবার দুপুরে বিচারক যখন দুই পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড ও বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ঘোষণা করেন, তখন কাঠগড়ায় থাকা আসামিরা ফেটে পড়েন তীব্র প্রতিক্রিয়ায়। রায় পরবর্তী এই হট্টগোল ও হাঙ্গামায় আদালত চত্বরে এক থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, রায় ঘোষণা শেষ হওয়ার পরপরই দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা চিৎকার শুরু করেন। ট্রাইব্যুনাল কক্ষ থেকে বের করে প্রিজনভ্যানে নেওয়ার সময় তারা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের সাথে সরাসরি ধাক্কাধাক্কি ও ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা উচ্চস্বরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে থাকেন। তাদের কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি অনাস্থা।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়সহ কারাদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা চিৎকার করে বলতে থাকেন, “আমরা এই রায় মানি না। আমাদের বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। আমরা সম্পূর্ণ নির্দোষ।” পুলিশের বেষ্টনী ভেঙে তারা বারবার উত্তেজিত ভঙ্গিতে কথা বলার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে সাবেক প্রক্টর ও স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতাদের অনুসারীদের মধ্যেও এ সময় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
আদালতের এই গম্ভীর পরিবেশে হঠাৎ এমন রাজনৈতিক স্লোগান ও বিশৃঙ্খলায় উপস্থিত আইনজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীরাও কিছুটা হতচকিত হয়ে পড়েন। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে যাবজ্জীবন দণ্ড পাওয়া সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান জীবন এবং তাজহাট থানার সাবেক ওসি রবিউল ইসলামকেও বেশ মারমুখী অবস্থানে দেখা যায়। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা বাড়তি শক্তি প্রয়োগ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন এবং দ্রুত আসামিদের প্রিজনভ্যানে তুলে নিয়ে যান।
প্রসিকিউশন পক্ষের আইনজীবীরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, আদালতের রায়ের পর এ ধরনের আচরণ বিচার ব্যবস্থার প্রতি চরম অবমাননা। তাদের মতে, মামলার ভিডিও ফুটেজ ও সাক্ষ্য-প্রমাণ যেখানে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট, সেখানে নিজেদের নির্দোষ দাবি করা এবং রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়া কেবল সাজার গুরুত্ব কমানোর একটি অপচেষ্টা মাত্র।
অন্যদিকে, বাইরে অপেক্ষারত জুলাই আন্দোলনের কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এই হট্টগোলের খবর পৌঁছালে তারাও পাল্টা স্লোগান দিতে শুরু করেন। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে কোনো বড় ধরনের সংঘর্ষ ঘটেনি। ট্রাইব্যুনালের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, রায়কে কেন্দ্র করে আগে থেকেই সতর্কতা ছিল, তবে আসামিরা যে আদালত কক্ষের ভেতরেই এতটা উগ্র আচরণ করবেন, তা ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত।
উল্লেখ্য, আজকের এই রায়ে ৩০ জন আসামির মধ্যে উপস্থিত ছয়জনকে তাদের অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাকি ২৪ জন পলাতক আসামির অনুপস্থিতিতেই বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই রায়ের পর আসামিদের এমন উসকানিমূলক আচরণ মামলার পরবর্তী আইনি লড়াইয়ে কোনো প্রভাব ফেলে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
বিকেল নাগাদ ট্রাইব্যুনাল এলাকা থেকে আসামিদের বহনকারী প্রিজনভ্যানটি কড়া পুলিশি পাহারায় কেন্দ্রীয় কারাগারের উদ্দেশে রওনা দেয়। পরিস্থিতি এখন শান্ত থাকলেও আদালত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।

